চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) সংসদীয় আসনে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনা ও দলীয় অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন আলহাজ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) তিনি দলের প্রতীক ধানের শীষ বরাদ্দের আনুষ্ঠানিক চিঠি গ্রহণ করেন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত প্রতীক বরাদ্দের চিঠিটি আজ দুপুরে জেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছেন গিয়াস কাদেরের ব্যক্তিগত সহকারী খোরশেদ আলম ও দলের দায়িত্বশীল সূত্র। এর মাধ্যমে রাউজানের রাজনীতিতে চলমান অনিশ্চয়তার একটি অধ্যায় আপাতত শেষ হলো।
এই মনোনয়নকে ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাউজান এলাকায় বিএনপির ভেতরে যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিল একই আসনে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া। প্রাথমিকভাবে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ার পর পরই দলীয় সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনে গোলাম আকবর খোন্দকারকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়। ফলে উভয় প্রার্থীই মনোনয়নপত্র দাখিল করলে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম বিভক্তি দেখা দেয়। আলাদা আলাদা গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠায় নির্বাচনী প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও।
শেষ পর্যন্ত গিয়াস কাদেরকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যমান ভোটব্যাংকের হিসাবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রাউজান এলাকায় গিয়াস কাদেরের দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সম্পৃক্ততা ও স্থানীয় সমাজে তার পরিচিতি এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো—চট্টগ্রাম-৬ আসন দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অতীতের নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে বিএনপির জন্য জয় নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থান তৈরি করাই বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ভোটারদের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ এবং বিরোধী রাজনীতির নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা বিএনপিকে কিছুটা আশাবাদী করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আসনে বিএনপির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে দলীয় ঐক্য কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা যায় তার ওপর। মনোনয়ন চূড়ান্ত হলেও গিয়াস কাদেরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মনোনয়নবঞ্চিত অংশকে এক ছাতার নিচে আনা। বিশেষ করে গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীরা যদি প্রচারণায় সক্রিয় না হন, তাহলে ভোট বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে, যা বিএনপির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে সবাই শেষ পর্যন্ত এক প্ল্যাটফর্মে আসবেন—এমন প্রত্যাশাই করছেন তারা। তবে বাস্তবে এই ঐক্য কতটা দৃশ্যমান হয়, সেটিই হবে নির্বাচনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
নির্বাচনী কৌশলের দিক থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গিয়াস কাদেরকে স্থানীয় ইস্যুগুলোকে সামনে আনতে হবে। উন্নয়ন বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো যদি কার্যকরভাবে তুলে ধরা যায়, তাহলে ভোটারদের সঙ্গে একটি আবেগী ও বাস্তব সংযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমর্থন মাঠে দৃশ্যমান করা বিএনপির জন্য বাড়তি শক্তি যোগাতে পারে।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম-৬ আসনে গিয়াস কাদেরের মনোনয়ন বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একটি অধ্যায়ের ইতি টানলেও সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা। ঐক্য, সংগঠন ও কৌশল—এই তিনের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই কেবল এই আসনে বিএনপি সম্মানজনক লড়াইয়ে নামতে পারবে, এমনকি ফলাফলে চমক দেখানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।