চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম পরিচালিত হয় এই বন্দরকে কেন্দ্র করে। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে সামান্য ব্যাঘাতও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এমন বাস্তবতায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতি ও ধর্মঘট ঘিরে যে অচলাবস্থা সৃপ্লষ্টি হয়েছে, তা দেশজুড়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে তুলেছে। প্রশ্ন উঠছে—এই সংকটের দায় কার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি দায় এড়ানোর পথে হাঁটছে?
এই আন্দোলনের মূল কারণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য ইজারা চুক্তির উদ্যোগ। শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি অংশ মনে করছে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হবে—এ আশঙ্কা থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক এ বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সংকটের দায় স্পষ্ট করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এটি সরকারি সিদ্ধান্ত এবং সরকার চুক্তি করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তা বাস্তবায়ন করবে। অর্থাৎ এনসিটি ইস্যু কোনো বন্দরের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়, এটি পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা।
তবুও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজে সামনে না এসে বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্রের মাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে বরং “বিশেষ মহলের ইন্ধন” এর মতো শব্দ ব্যবহার করে আন্দোলনের দায় অন্যের ওপর চাপানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি সংকট কি এভাবে দায় এড়িয়ে সমাধান করা সম্ভব?
অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আবদুস সোবহান মনে করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা না থাকলে সংকট অবশ্যম্ভাবী। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল জনগণের আস্থা ফেরানো এবং বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোতে পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বন্দর ইস্যুতে সরকার নীরব থেকে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। বন্দর অচল মানেই অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “রমজানের আগে এই ধরনের অচলাবস্থা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলবে এবং সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বন্দরের অচলাবস্থায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরাও। সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অপু বড়ুয়া বলেন, “বন্দর বন্ধ থাকলে আমাদের কাজ পুরোপুরি থেমে যায়। কনটেইনার খালাস আটকে থাকে, জট তৈরি হয় এবং আমদানিকারকদের বাড়তি খরচ বাড়ে। এই ক্ষতির দায় শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না, সরকারকেই জবাব দিতে হবে।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ছিল শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসা এবং সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু এখনো সরকার দাবি করছে চুক্তি হয়নি, অথচ আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে আগেই। এতে প্রশ্ন আরও গভীর হচ্ছে—চুক্তি না হলে এত গোপনীয়তা কেন? শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কেন এমন উদ্যোগ নেওয়া হলো? বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে জাতীয় সম্পদ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে?
রমজানের আগে বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের একটি বড় দায়িত্ব। কিন্তু বন্দর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে আমদানি পণ্য আটকে যাবে, সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হবে এবং দ্রব্যমূল্য বাড়বে। ফলে এই সংকট শুধু শ্রমিকদের আন্দোলন নয়, এটি সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলনও বটে।
সংকট নিরসনের বদলে প্রশাসনিক দমননীতির পথ বেছে নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ধর্মঘটে অংশ নেওয়ায় চার কর্মচারীকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে এবং বন্দর এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, আলোচনা না করে চাপ প্রয়োগ সংকট সমাধানের পথ নয়, বরং এতে উত্তেজনা বাড়বে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সরকারকে সামনে এসে জবাবদিহি করতে হবে। দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রাণকেন্দ্র। এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে, অন্যথায় এই সংকট দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
তাপস বড়ুয়া/নাগরিক নিউজ