বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন বিরোধী শক্তির পুনর্গঠন, ঐক্য এবং নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ ও তার পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে কৌতূহল ও আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাগ, অভিমান এবং দূরত্ব কি তবে এবার কাটতে যাচ্ছে? অলি আহমেদ কি তার পুরোনো রাজনৈতিক ঠিকানা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সঙ্গে আবারও হাত মেলাবেন, এই প্রশ্ন এখন শুধু রাজনৈতিক মহলেই নয়, সাধারণ জনগণের মধ্যেও আলোচনার কেন্দ্রে।
এই আলোচনার সূত্রপাত মূলত সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনায়। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব রিদোয়ান আহমেদের বিএনপিতে যোগদান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিয়েছে। অনেকেই এটিকে এলডিপি ও বিএনপির মধ্যকার দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। এই ঘটনার পরপরই আলোচনায় উঠে আসেন কর্নেল অলি আহমেদের ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে তার নাম সামনে আসায় রাজনৈতিক কৌতূহল আরও বেড়ে যায়।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অধ্যাপক ওমর ফারুক এলডিপির প্রতীক ‘ছাতা’ ছেড়ে বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, এমন সম্ভাবনাই এখন বেশি আলোচিত। বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হলেও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা এই গুঞ্জনকে আরও জোরালো করেছে।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে তাকে ঘিরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও আলোচনার কমতি নেই। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষিত, গ্রহণযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করলে ওই আসনে বিএনপির অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই ফিরে আসে কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নাম।বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত অলি আহমেদ একসময় দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতানৈক্যের জেরে তিনি বিএনপি ত্যাগ করে এলডিপি গঠন করেন। সেই সময় থেকে বিএনপি ও অলি আহমেদের সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত বিষয় হয়ে রয়েছে।তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করা এবং বিরোধী শক্তির মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতায় পুরোনো বিভাজন ভুলে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে সমঝোতার পথ খোলা থাকাই স্বাভাবিক। রিদোয়ান আহমেদের বিএনপিতে যোগদান, ওমর ফারুকের ধানের শীষে নির্বাচন করার আলোচনা এবং বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ, সব মিলিয়ে অনেকেই মনে করছেন, এটি নিছক কাকতালীয় নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিতও হতে পারে।
সাধারণ জনগণের মধ্যেও এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, দীর্ঘদিনের রাগ ও অভিমান কি এবার সত্যিই মিটতে যাচ্ছে? অলি আহমেদ যদি বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিরোধী রাজনীতিতে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে। এতে সরকারবিরোধী রাজনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে এবং মাঠের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।
যদিও এখন পর্যন্ত কর্নেল অলি আহমেদ, অধ্যাপক ওমর ফারুক কিংবা বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে সময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর। তবে একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, অলি আহমেদ ও তার পরিবারকে ঘিরে এই রাজনৈতিক কৌতূহল আপাতত দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েই থাকবে।