নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম ওয়াসার ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে সরকারের কোষাগারে ফেরত গেছে ৭৬০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর ফলে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া ৫ হাজার ১৫২ কোটি টাকার ‘স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ প্রকল্পটি বড় ধরনের দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে যাচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ভূমি বরাদ্দ সম্ভব না হলেও, আগামী অর্থবছরেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আশাবাদী ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম মহানগরীর কালুরঘাট ও বাকলিয়া এলাকায় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য ৫ হাজার ১৫২ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি গত বছরের (২০২৫) জানুয়ারিতে একনেকে অনুমোদন পায়।
মোট ব্যয়: ৫,১৫২ কোটি টাকা।
জাইকার অর্থায়ন: ৪,১৪৪ কোটি টাকা।
সরকারি তহবিল (জিওবি): ৯৫৩ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার নিজস্ব তহবিল: ৩৯ কোটি টাকা।
উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ম: দেশে চলমান সব বড় প্রকল্পের মতোই, দাতা সংস্থা জাইকা কেবল প্ল্যান্ট নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়। নিয়মানুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণের সম্পূর্ণ খরচ সরকারকে বহন করতে হয়।
পুরো চট্টগ্রাম মহানগরীকে স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে মোট ৬টি ক্যাচমেন্ট জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে কালুরঘাট (ক্যাচমেন্ট-২) ও বাকলিয়া (ক্যাচমেন্ট-৪) এলাকার জন্য কর্ণফুলী নদীর তীরে হামিদচর এলাকায় ৭৪ একর জায়গা চিহ্নিত করা হয়।
এই ভূমি অধিগ্রহণের জন্য আলাদাভাবে ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে সরকার ৮৬১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা অনুদান এবং ১ হাজার ২৯২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে ওয়াসাকে দেবে। প্রকল্পের আওতায় শুধু ভূমি অধিগ্রহণের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ভূমি উন্নয়ন, ক্ষতিপূরণ, সীমানা প্রাচীর, কালভার্ট ও রাস্তা নির্মাণ খাতে ব্যয় হবে।
চলতি অর্থবছরে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ৭৬০ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল ওয়াসা। কিন্তু জেলা প্রশাসন ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতে না পারায় এই বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করা সম্ভব হয়নি। গত ৬ মে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো চট্টগ্রাম ওয়াসার তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগমের এক চিঠি থেকে অর্থ ফেরতের এই তথ্য জানা গেছে।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের পর ১২ মে প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়। ৫ অক্টোবর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ এবং ১৬ নভেম্বর জেলা প্রশাসনের কাছে ভূমির আবেদন করা হয়। তবে জেলা প্রশাসন চলতি বছরের ১৪ মে সরেজমিন সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ১৬ জুন জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভা করে। ফলে জুন মাসের মধ্যে অর্থ ছাড় করার মতো আইনি প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি।
কাজী নুরুল আমিন (প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম ওয়াসা):
“জেলা প্রশাসন ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতে না পারায় তাদের টাকা দেওয়া যায়নি। ফলে টাকা ফেরত গেছে। তবে আগামী অর্থবছরে আবারও টাকা চাওয়া হবে। এলএ (Land Acquisition) কেস নম্বর পাওয়া গেলেই আমরা জেলা প্রশাসনকে অগ্রিম টাকা দিয়ে দেব, যা পরে চূড়ান্ত মূল্যের সাথে সমন্বয় করা হবে।”
মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক-ভূমি অধিগ্রহণ, চট্টগ্রাম):
“ভূমি অধিগ্রহণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই ভূমি বরাদ্দের প্রস্তাব আমরা কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির কাছে পাঠাব, যা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে অনুমোদিত হয়ে আসবে। এরপর ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের কাছে এলে একটি এলএ কেইস নম্বর পড়বে। যৌথ সার্ভে করে ভূমির মূল্য চূড়ান্ত করার পরই ওয়াসার কাছে টাকা চাওয়া হবে।”
মাহমুদুল হাসান (মহাপরিচালক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা পরিবীক্ষণ অনুবিভাগ):
“মন্ত্রণালয়ের অধীনে বর্তমানে ২৩০টি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকার কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ ফেরত যাচ্ছে, যার সিংহভাগই ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে। যেহেতু এটি বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্প, তাই আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে দ্রুত কাজটি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
এস এম শাকিল আখতার (সদস্য, পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ):
“ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় টাকা ফেরত আসার পেছনে প্রকল্প পরিচালকদের যেমন দায় রয়েছে, তেমনিভাবে কাগজপত্রের ঘাটতিও অন্যতম একটি বড় ফ্যাক্টর।”
১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৫৫ বছর পর ২০১৮ সালে প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্পের অনুমোদন পায়। বর্তমানে পুরো শহরকে স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কে আনতে একাধিক জোনে কাজ চলছে:
| ক্যাচমেন্ট জোন | আওতাভুক্ত এলাকা | অর্থায়ন ও ব্যয় | বর্তমান অবস্থা ও লক্ষ্যমাত্রা |
| ক্যাচমেন্ট-১ | হালিশহর ও সংলগ্ন এলাকা | ৫,২১৯ কোটি টাকা (সংশোধিত) | ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য। |
| ক্যাচমেন্ট-৫ | কাট্টলী ও সাগরপাড় এলাকা | ২,৭৮০ কোটি টাকা (ফ্রান্সের অর্থায়ন) | পরামর্শক নিয়োগ শেষ, ডিজাইনের কাজ চলছে। |
| ক্যাচমেন্ট-৩ | ফতেয়াবাদ, অক্সিজেন, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও | ২,০০০ কোটি টাকা (কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক) | ২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য। |
| ক্যাচমেন্ট-২ ও ৪ | কালুরঘাট থেকে পূর্ব বাকলিয়া হয়ে ফিরিঙ্গীবাজার | ৫,১৫২ কোটি টাকা (জাইকা) | ভূমি জটিলতায় আক্রান্ত, ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। |
| ক্যাচমেন্ট-৬ | নির্দিষ্ট জোন | পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) | বর্তমানে কাজ চলমান। |