নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ ইলিয়াসের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন জালিয়াতি, সরকারি জমি আত্মসাৎ, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা এবং ফাইলবন্দি হাজার কোটি টাকার অনিয়মের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। ২০০৬ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চউকে যোগ দেওয়া এই প্রভাবশালী কর্মকর্তা ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব পালনকালে ড্যাপ (ডিএপি), ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে নকশা অনুমোদনের ‘মহোৎসব’ চালিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, নগরের জামালখান আসকার দিঘির পাড়ে সংরক্ষিত পাহাড়ের ঢাল কেটে একটি ১৪ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল চূড়ান্ত নকশা অনুমোদন দেন ইলিয়াস। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে চউক এই প্রকল্পে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে কাজ বন্ধ করলেও, মূল হোতা মোহাম্মদ ইলিয়াসের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া, আকবর শাহ এলাকায় শাশুড়ির নামে কেনা প্লটে পাহাড় কাটার অভিযোগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পরিবেশ অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় কোনো বৈধ প্রবেশপথ বা নিজস্ব রাস্তা এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনাপত্তি (NOC) ছাড়াই ‘মুনতাসির বিল্ডিং লিমিটেড’-এর একটি ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিনিময়ে তিনি মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা (ঘুষ) নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানায় রূপান্তর করার এক অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেন এই কর্মকর্তা। নগরের দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে নকশা অনুমোদনের আবেদন করা হলে ইমারত পরিদর্শক তাতে লিখিত আপত্তি জানান। কিন্তু মোহাম্মদ ইলিয়াস ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি ভুয়া ও জাল বিএস (BS) খতিয়ান প্রস্তুত করিয়ে সেখানে বেজমেন্টসহ ১৩ তলা ভবনের নকশা পাস করিয়ে দেন।
অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হালিশহর এলাকায় ‘ডিজাইন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি বেনামী নিজস্ব কনসালটিং ফার্ম চালাতেন ইলিয়াস। নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই ফার্মের মাধ্যমে জমা দেওয়া বিতর্কিত ফাইলগুলোই চউকে দ্রুত অনুমোদন পেত।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে, পরবর্তীতে তা পুনরায় ‘রেমিট্যান্স’ আকারে দেশে এনে বৈধ করার কৌশল নেন তিনি। এই কালো টাকা দিয়ে চট্টগ্রামের সোনালী আবাসিক এলাকায় মা ও শাশুড়ির নামে দুটি ৭ তলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম-১ কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আল-আমিন জানান, “এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।” আইনজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় চাকরিচ্যুতি থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে এই কর্মকর্তার।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ ইলিয়াস নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, “দায়িত্বকালীন সময়ে আমি কোনো নিয়ম ভঙ্গ করিনি। আমার আত্মীয়রা প্রবাসে থাকায় তারা নিজেদের অর্থে সম্পত্তি কিনেছেন। আর সরকারি বেতনে চলা কঠিন হওয়ায় বিকেল ৫টার পর এক বন্ধুর কনসালটিং ফার্মে সময় দিতাম, যা মূলত মানুষের উপকারের জন্য।”
এদিকে চউকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন এই বিষয়ে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “সিডিএতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, এতসব গুরুতর এবং দালিলিক অভিযোগ থাকার পরও মোহাম্মদ ইলিয়াস বর্তমানে চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন, যা নিয়ে খোদ সংস্থার ভেতরেই চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।