দক্ষিণ চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ অবৈধ কাঠ পাচার
বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ, ইটভাটায় পুড়ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ
দক্ষিণ চট্টগ্রামে অবৈধ কাঠ পাচার আর কোনো গোপন কার্যক্রম নয়; এটি এখন সংঘবদ্ধ ও নিয়মিত একটি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ওপর। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আসবাবপত্র তৈরির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বনজ কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে।
বিশ্বস্ত একাধিক সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় চকরিয়া, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ এলাকার বহু ইটভাটায় নির্বিচারে বনাঞ্চলের কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এসব কাঠের বড় অংশ আসছে চুনতি রেঞ্জসহ আশপাশের সংরক্ষিত বন এলাকা থেকে।
সূত্র মতে, কাঠ পাচারকারী ও ইটভাটা মালিকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট একটি মৌসুমের জন্য প্রায় ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনকে ‘ম্যানেজ’ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, চুনতি রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা রেঞ্জ অফিসার আবির হোসেন এই সমন্বয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এর ফলে প্রতিদিন শত শত ট্রাক কাঠ নির্বিঘ্নে বিভিন্ন ইটভাটায় প্রবেশ করছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, পদুয়া ফরেস্ট চেক স্টেশন থাকলেও সেটি কার্যত নিষ্ক্রিয়। বন উজাড় রোধে এই চেক স্টেশন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী এ অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটা, জোত বিক্রি কিংবা কাঠ পরিবহনের অনুমতি (পারমিট) দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, রেঞ্জ অফিসার আবির হোসেন ও সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কাঠ পাচার অব্যাহত রয়েছে। চুনতি রেঞ্জের ফরেস্ট চেক স্টেশন দিয়েই প্রতিদিন কোটি টাকার কাঠ পাচার হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। রেঞ্জ কর্মকর্তা, চেক স্টেশনের কিছু কর্মচারী ও পাচারকারী সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে দিনরাত এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কাঠ পাচার থেকে দৈনিক অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ প্রায় এক লাখ টাকা, যা মাস শেষে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে বলেও স্থানীয়দের দাবি। মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘মাসোহারার’ বিনিময়ে বন বিভাগের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
চুনতি চেক পোস্ট দিয়ে প্রতিদিন বাঁশ, গোল কাঠ, চেরা কাঠ ও ফার্নিচার বোঝাই অন্তত ৫০টির বেশি যানবাহন চলাচল করে। এসব গাড়ি পারাপারে গাড়িপ্রতি এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পদুয়া রেঞ্জের আওতাধীন এলাকার ফার্নিচার দোকান সমিতি থেকেও প্রতিবছর কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চুনতি রেঞ্জ অফিসার আবির হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, সব অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন সময় মাঠপর্যায়ের এসব কার্যক্রম পরিচালনায় রেঞ্জ অফিসার আবির হোসেনকে ব্যবহার করে থাকেন। দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিকবার গণমাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হলেও রহস্যজনক কারণে রেঞ্জ অফিসার আবির হোসেন বরাবরই আড়ালে থেকে যান বলে দাবি এলাকাবাসীর।