রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঐতিহাসিক সিআরবি ভবনে আজও সচল ব্রিটিশ আমলে লাগানো ফ্যান ও লাইট। প্রায় শত বছরের পুরোনো এসব সরঞ্জাম এখনও স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। অথচ একই প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক সময়ে কেনা সুইচ, প্লাগ, লাইট, ফ্যান কিংবা ক্যাবল—এসবের কার্যক্ষমতা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রেলওয়ের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।
এ বিভাগের বিভিন্ন সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম, কারসাজি ও কমিশন বাণিজ্য নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই সরঞ্জাম কেনার নামে তৈরি হয় ভাউচার; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে পণ্যই আনা হয় না। আবার যখন সরঞ্জাম কেনা হয়, তখন পছন্দের ঠিকাদার–সাপ্লাইয়ারদের মাধ্যমে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয় উচ্চমূল্যে। এতে সরকারি অর্থ অপচয় যেমন ঘটে, তেমনি রেলওয়ের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
এই অভিযোগগুলো নিয়ে জানতে প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী শফিকুর রহমানের সঙ্গে বহুবার যোগাযোগ করা হয়। ফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। গত তিন সপ্তাহে ১১ দিন অফিসে গিয়েও তার দেখা মেলেনি। দপ্তরের একজন কর্মচারী জানান, তিনি নিয়মিত অফিসে আসেন না—সপ্তাহে এক-দুদিন এসে স্বাক্ষর সেরেই চলে যান। বাকিটা সময় ঢাকায় থাকেন।
তবে গত সোমবার হঠাৎ অফিসে পাওয়া গেলে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমার দপ্তরে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই। রেলের মধ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পাওয়া দপ্তর আমারটি। বড় কোনো কেনাকাটাই হয় না। আমার নামে-বেনামে কোনো ঠিকাদারি লাইসেন্সও নেই।” তিনি দাবি করেন, গত অর্থবছরে তার অফিসে কয়েকটি আসবাবপত্র ছাড়া কোনো কেনাকাটা হয়নি। “বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকার ক্রয় হয়,”—বলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, “অন্যান্য চার দপ্তরে যে সব ক্রয় হয়, সেগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। রেলে আমার মতো সৎ অফিসার আর একজনও পাবেন না।”
তার উপস্থিতিতেই বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান জানান, তার দপ্তরে বরাদ্দ সীমিত ছিল। “মোটামুটি পাঁচ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। আরও পাঁচ কোটি টাকা ফেরত গেছে,” বলেন তিনি। যদিও এসব কেনাকাটা প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে, তবুও দায়িত্বের চাপ এসে পড়ে বিভাগীয় প্রকৌশলীর ওপর।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
ব্রিটিশ আমলের টেকসই সরঞ্জাম যেখানে এখনও সচল, সেখানে আধুনিক যুগের নতুন সরঞ্জাম দ্রুত অচল হয়ে পড়ায় রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগে অনিয়ম ও মানহীন ক্রয়ের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থই নষ্ট হচ্ছে না, রেলসেবার নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।