সরকারের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে লাগাতার কর্মবিরতিতে অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। শ্রমিক ও কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। জেটিতে জাহাজ থাকলেও পণ্য খালাস বা বোঝাই হচ্ছে না, বন্ধ রয়েছে জাহাজের আগমন ও বহির্গমন। ফলে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে এবং বন্দরের ভেতরে কন্টেনারের জট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে গত শনিবার থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মসূচিতে যান। শুরুতে নির্দিষ্ট সময়ের কর্মবিরতি থাকলেও পরে তা লাগাতার কর্মবিরতিতে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্বচ্ছ আলোচনা বা স্পষ্ট অবস্থান না থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সরেজমিনে বন্দর এলাকায় দেখা যায়, এনসিটি ও চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি) এলাকায় কোনো কার্যক্রম নেই। গ্যান্ট্রি ক্রেন বন্ধ, ট্রাক ও কন্টেনার মুভারের চলাচলও নেই। পাইলট ও মুরিং গ্যাং কাজ না করায় জাহাজগুলো জেটিতে অলস পড়ে আছে। বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রধান টার্মিনালগুলো বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিপণ্য নির্ধারিত মাদার ভ্যাসেল ধরতে না পারার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দর অচলাবস্থা নিরসনে গতকাল বিকেলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যে সৃষ্ট ক্ষতির কথা তুলে ধরে কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তবে আন্দোলনকারীরা জানান, এনসিটি ইজারা বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা না এলে আন্দোলন থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। ফলে বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চললেও সরকার সমস্যার সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগ নিচ্ছে না। তারা বলেন, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল এবং আন্দোলনে জড়িত শ্রমিক নেতাদের বদলির আদেশ প্রত্যাহারের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে আন্দোলনের মধ্যে কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে অন্য বন্দরে বদলি করার ঘটনায় শ্রমিক-কর্মচারীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বন্দর সংলগ্ন এলাকায় অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। সমাবেশ থেকে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
তবে চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক অচলাবস্থার মধ্যেও পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে সীমিত আকারে কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে। সেখানে একটি জাহাজ ভেড়ানো হয়েছে এবং বহির্নোঙরে থাকা কয়েকটি খোলা পণ্যবাহী জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের কাজ চলছে। কিন্তু প্রধান টার্মিনালগুলো বন্ধ থাকায় এতে সামগ্রিক সংকটের কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না এলে চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি আয়ের ওপর—যার দায় এড়াতে পারবে না সরকার।