ধারাবাহিক পর্ব -১
সহকারী বন সংরক্ষকসহ তিন রেঞ্জ কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় অবৈধ কাঠ কাটা, বালি উত্তোলন ও টিপি ছাড়াই কাট পাচার।
নাগরিক নিউজ ডেস্ক:
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের পদুয়া ও চুনতী রেঞ্জে পরিকল্পিতভাবে বন ও নদীসম্পদ লুটপাট চলছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের সার্বিক তদারকির আওতায় পদুয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. বজলুর রশিদ এবং চুনতী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবির হাসানের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় অবৈধ গাছ কাটা, বালি উত্তোলন এবং টিপি (Transit Permit) ছাড়াই কাঠ পাচার দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে চলছে।
ইটভাটার মৌসুমে বন উজাড়ের অভিযোগ:
অভিযোগ অনুযায়ী, ইটভাটার মৌসুম এলেই কাঠ পাচার তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে যায়। সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন কাঠ পাচারকারী ও ইটভাটার মালিকদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে পুরো মৌসুম ‘ম্যানেজ’ করে দেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এর ফলে প্রতিদিন শতশত ট্রাক কাঠ পদুয়া ও চুনতী রেঞ্জ অতিক্রম করে চকরিয়া, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন ইটভাটায় পৌঁছে যাচ্ছে।
পদুয়া রেঞ্জে অবৈধ কাঠ কাটার ফিরিস্তি:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পদুয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. বজলুর রশিদের দায়িত্বাধীন বনাঞ্চলে রাতের আঁধারে এবং কখনো প্রকাশ্য দিনেও গাছ কাটা হচ্ছে। এসব কাঠ টিপি ছাড়াই ট্রাক ও ট্রলিযোগে পাচার করা হলেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো বাধা নেই বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, কাঠবোঝাই গাড়ি থেকে নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ আদান–প্রদানের মাধ্যমে বন ফাঁড়ি ও চেকপোস্ট পার হওয়া হচ্ছে। এতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
চুনতীতে কাট এবং বালি ও টিপি ছাড়াই পাচার:
চুনতী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবির হাসানের বিরুদ্ধেও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও আশপাশের খাল–নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি টিপি ছাড়াই কাঠ ও বাঁশ পাচার হচ্ছে ইটভাটা ও ফার্নিচার কারখানায়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড চলাকালে দৃশ্যমান কোনো অভিযান, জব্দ বা মামলা না থাকায় এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাহলে কার প্রশ্রয়ে চলছে এই লুটপাট?
চেকপোস্টে ঘুষের অভিযোগ:
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, পদুয়া ও চুনতী ফরেস্ট চেকপোস্টগুলো বন রক্ষার ফাঁড়ি না হয়ে ঘুষ আদায়ের টোলপ্লাজায় পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী—
বাঁশবোঝাই গাড়ি: ১ হাজার টাকা
গাছবোঝাই গাড়ি: ৩–৫ হাজার টাকা
ফার্নিচারবাহী গাড়ি: ২–১০ হাজার টাকা
স্থানীয় কাঠবোঝাই ট্রলি: ২০০–৫০০ টাকা
প্রতিদিন এসব অবৈধ লেনদেনের অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে প্রায় এক লাখ টাকা, যা মাসে ২০–৩০ লাখ টাকায় পৌঁছায় বলে দাবি স্থানীয়দের।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে:
পরিবেশবিদদের মতে, অবৈধ গাছ কাটা ও বালি উত্তোলনের ফলে চুনতী ও পদুয়া অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে, ধ্বংস হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
অভিযুক্তদের বক্তব্য:
এ বিষয়ে সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি নাগরিক নিউজের ফোন রিসিভ করেন নি পরে হোয়াটসঅ্যাপে কল এবং এস এম এস দেওয়া হলে সংযোগাযোগ সংযোগ স্থাপন করেন নি।
পদুয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. বজলুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চুনতী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবির হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“এই অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। প্রমাণ থাকলে তদন্ত হোক।”
সচেতন মহলের দাবি :
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশকর্মীরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি, এবং দোষ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পদুয়া ও চুনতীর বনাঞ্চল অচিরেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
প্রিয় পাঠক : চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফিরিস্তি নিয়ে নাগরিক নিউজে শীঘ্রই আসচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব। চোখ রাখুন নাগরিক নিউজ এ।