কমিশনের দৌরাত্ম্য: কামরুলের সাম্রাজ্য!
ইইডিতে ঘুষ–সিণ্ডিকেটের মহোৎসব!
স্কুল–মাদ্রাসা ভবন নির্মাণে লুটপাট!
ইইডির কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য!
দরপত্রে প্রভাব, বিলে গুণে গুণে কমিশন!
চট্টগ্রাম ইইডিতে কাগজে কাজ, টাকায় লুট!
দেশের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, আসবাবপত্র সরবরাহ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও আইসিটি সুবিধা স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেখে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)। অথচ দপ্তরটি ঘিরে বছরের পর বছর ধরে চলছে প্রকৌশলীদের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ।
সারা দেশের মতো চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরেও দুর্নীতির বিস্তর চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে—দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল আহসান যোগদানের পর থেকেই এখানে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির শক্তিশালী দুর্গ। ঠিকাদার নিয়োগ থেকে বিল পরিশোধ, দরপত্র প্রক্রিয়া, অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন ও ‘পারসেন্ট’ কমিশন—সব ক্ষেত্রেই চলছে তার আধিপত্য।
ইইডি সূত্র জানায়, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও দপ্তরের উচ্চমান সহকারী মিলিয়ে একটি প্রভাবশালী সিণ্ডিকেট তৈরি হয়েছে। তাদের কাছাকাছি থাকা ঠিকাদাররাই কাজ পাচ্ছেন, আর বাইরে থাকা ঠিকাদারদের কাজ পেতে হয়রানি ও কমিশন দিতে হচ্ছে ৫% থেকে ১০% পর্যন্ত।
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, কামরুল আহসান ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। কিছু ক্ষেত্রে কাজ শেষ হওয়ার আগেই দেওয়া হয়েছে অগ্রিম বিল, যেখানেও কাটমানি নিশ্চিত করেছেন তিনি। রেট শিডিউল ফাঁস করে মোটা অঙ্কের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ‘কামরুলচক্রের’ বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রামজুড়ে কারিগরি স্কুল-কলেজ (টিএসসি) ও বিভিন্ন মাদ্রাসা ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের সামগ্রী। ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ইইডির অভ্যন্তরীণ সূত্রের।
গত অর্থবছর ও চলমান অর্থবছরে চট্টগ্রামের মোট ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টিই পুরনো প্রকল্প হলেও সেগুলোর পুনঃদরপত্র বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশ করেননি নির্বাহী প্রকৌশলী। প্রভাব খাটিয়ে এসব কাজে কোটি কোটি টাকার ‘কমিশন বাণিজ্য’ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে এই সিণ্ডিকেট অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটে নিয়েছে। এ ঘুষ–বাণিজ্যের ভাগ পেয়েছেন দপ্তরের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরাও ঠিকাদারদের প্রলোভনে অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল আহসান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি যাদের পছন্দ করেন, তারাই কাজ পান; অন্যরা হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হন।
একজন ঠিকাদার বলেন,
“কামরুল আহসান পুরো দপ্তরকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন। তার সিণ্ডিকেট ছাড়া এখানে কেউ কাজই পায় না।”
ভুক্তভোগী একাধিক ঠিকাদার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর কাছে এই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ,
“চট্টগ্রামজুড়ে স্কুল–মাদ্রাসা ভবন নির্মাণে তিনি লাখ লাখ টাকার দুর্নীতি করেছেন। কাজের আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেন। দুদক তদন্ত করলে সবই প্রমাণ পাওয়া যাবে।”
ইইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান—
“যেসব ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়, তাদের আমরা কালো তালিকাভুক্ত করি। নির্বাহী প্রকৌশলীও আইনের ঊর্ধ্বে নন। তিনিও অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল আহসানের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ইইডির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানান,
“দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের কারণে প্রকল্পে স্বচ্ছতা নেই, আছে গাফিলতি, অযোগ্যতা, ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য ও নানা অনিয়ম। এতে পুরো দপ্তরে চরম অস্থিরতা নেমে এসেছে। এত অভিযোগের পরও যেন দেখার কেউ নেই।”