আজ ১ ডিসেম্বর, শুরু হলো বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় মাস—বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাস এটি। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পূর্ণতা আসে এই মাসেই।
প্রতি বছর এই দিনে জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করে শহীদদের এবং উৎসবের আমেজে স্বাগত জানায় ডিসেম্বরকে, যে মাস বাঙালি জাতির হাজার বছরের স্বপ্নসাধ পূরণ করেছিল।
চূড়ান্ত মুহূর্ত: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা আক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। মুক্তিবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধ ও একের পর এক সফল অভিযানে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
আন্তর্জাতিক চাপ: ১ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে রাজ্যসভার অধিবেশনে উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণের জন্য ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান।
হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা: পরাজয় আসন্ন জেনেও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা তাদের নৃশংসতা আরও বাড়িয়ে তোলে। ১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জিঞ্জিরাতে সারিবদ্ধভাবে ৮৭ জন নিরীহ মানুষকে হত্যার ঘটনা উঠে আসে।
আত্মসমর্পণ: ডিসেম্বরের ঘটনাবহুল দিনগুলো দ্রুত বাংলাদেশকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নিয়ে যায়। অবশেষে, ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
প্রতি বছরের মতো এবারও বিজয়ের মাস নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাসব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
জাতীয় কর্মসূচি: ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে সরকার বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
শ্রদ্ধা নিবেদন: ১৬ ডিসেম্বর ভোরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: ১৪ ডিসেম্বর পালন করা হবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, যেদিন জাতি চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে হারানো তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করবে।
ডিসেম্বর মাস একদিকে যেমন চূড়ান্ত বিজয়ের আনন্দ বহন করে, তেমনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের বেদনা নিয়েও আসে। এই মাস বাঙালি জাতিকে তার জাতীয়তাবাদ ও আত্মপরিচয়ের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার কথা মনে করিয়ে দেয়।