(ধারাবাহিক প্রতিবেদন : পর্ব–১)
নিজস্ব প্রতিবেদক | বান্দরবান
বান্দরবানের থানচি উপজেলার সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট এখন প্রকাশ্য লুটপাটের শিকার। সংরক্ষিত এই বনাঞ্চল উজাড়ের নেপথ্যে রয়েছেন বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা থানচি রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইল—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইলের প্রত্যক্ষ মদদে সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঠ কাটা হচ্ছে এবং তা সাঙ্গু নদীপথে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই অবৈধ কাঠের একটি বড় অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে থানচি উপজেলার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা সুজনের মালিকানাধীন একটি ইটভাটায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উক্ত ইটভাটায় প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এসব কাঠের অধিকাংশই সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা। অথচ বিষয়টি জেনেও বনবিভাগ কার্যত চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অভিযানের কোনো উদ্যোগ তো দূরের কথা, উল্টো পুরো কর্মকাণ্ড ‘ম্যানেজ’ করে পাহারাদারের ভূমিকায় রয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইল।
অভিযোগ রয়েছে, তথাকথিত “মৌসুম ব্যবস্থাপনা”র নামে আওয়ামী লীগ নেতা সুজনের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে পুরো অবৈধ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, সাঙ্গু রিজার্ভ এলাকায় বর্তমানে দুই শতাধিক শ্রমিক অবৈধভাবে কাঠ কাটছে, যা রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইলকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েই সম্ভব হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
প্রতিদিন রাতের আঁধারে চালি ও নৌযানের মাধ্যমে শত শত কাঠের গাছ পাচার হয়ে বান্দরবান সদরের দিকে চলে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, এ পর্যন্ত কাঠ চোরাকারবারিদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইল।
স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বলছেন, একজন দায়িত্বশীল বন কর্মকর্তার এমন ভূমিকার কারণে সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট দ্রুত ধ্বংসের মুখে পড়েছে। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়লেও বনবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে থানচি রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সরাসরি বক্তব্য না দিয়ে “এসে দেখে কথা বলুন” বলে এড়িয়ে যান।
তবে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, “ইটভাটা অবৈধ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের। বনবিভাগের করার কিছু নেই। তবে কাঠ পোড়ানো বেআইনি—এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।”
রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে বান্দরবান জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি জানান, “থানচির অবৈধ ইটভাটা আমরা ভেঙে দিয়েছি। মামলা প্রক্রিয়াধীন। আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—যে রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব বন রক্ষা করা, সেই কর্মকর্তা নিজেই যদি বন উজাড়ের মূল কারিগর হন, তাহলে সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট রক্ষা করবে কে?
প্রিয় পাঠক পরবর্তী পর্বে: কীভাবে রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাইলের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে কাঠ পাচারের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত।
পর্ব–২ (কাঠ পাচার সিন্ডিকেট ও আর্থিক লেনদেন)
পর্ব–৩ (প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দায়িত্বশীলদের ভূমিকা)