আ ন ম সানাউল্লাহ, চট্টগ্রাম
পবিত্র রমজান মাস এলেই চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে ভেসে ওঠে এক অনন্য মানবিক দৃশ্য। বিকেল গড়াতেই মসজিদের ভেতর, বারান্দা এবং চত্বরে জড়ো হতে শুরু করে হাজার হাজার রোজাদার। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শ্রমিক, কেউ ছাত্র, আবার কেউ চাকরিজীবী। কিন্তু ইফতারের কাতারে বসার পর যেন সব ভেদাভেদ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। সেখানে ধনী-গরিবের পার্থক্য নেই, নেই সামাজিক অবস্থানের কোনো বিভাজন—সবার পরিচয় তখন একটাই, তারা রোজাদার।
মাগরিবের আজানের অপেক্ষায় মসজিদের মেঝেতে দীর্ঘ সারিতে বসে থাকে মানুষ। সামনে সাজানো থাকে একই ধরনের ইফতারি—মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, খেজুর, জিলাপি ও শরবত। আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে ইফতার শুরু করেন। সেই মুহূর্তে তৈরি হয় এক বিরল দৃশ্য—অচেনা মানুষও হয়ে ওঠেন আপন, আর একই খাবার ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বন্ধন।
রমজানজুড়ে প্রতিদিন এখানে কয়েক হাজার মানুষের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। বিকেল গড়াতেই স্বেচ্ছাসেবকরা প্লেটে সাজিয়ে ইফতারি পৌঁছে দেন রোজাদারদের কাছে। বিশাল ড্রামে তৈরি করা হয় শরবত, আর সারি সারি প্লেট হাতে হাতে বিলিয়ে দেওয়া হয়। রমজানের শুরুতে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন হাজার মানুষ ইফতার করেন, আর মাসের মাঝামাঝি সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে চার থেকে পাঁচ হাজারে পৌঁছে যায়।
এই বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয় আগের দিন থেকেই। বাবুর্চিরা ছোলা ও ডাল ভিজিয়ে রাখেন, আর ভোর হতেই শুরু হয় রান্নার ব্যস্ততা। বড় বড় হাঁড়িতে ছোলা সেদ্ধ হয়, বিশাল কড়াইয়ে একসঙ্গে কয়েক ডজন কেজি পেঁয়াজু ও বেগুনি ভাজা হয়। প্রায় ১০–১২ জন বাবুর্চি এবং ৩০–৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক এই পুরো আয়োজন পরিচালনায় নিরলস পরিশ্রম করেন। আসরের নামাজ পর্যন্ত চলে রান্না ও প্রস্তুতির কাজ।
এই গণ-ইফতারের সূচনা হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। ১৯৯৬ সালে মক্কা ও মদিনা-তে হাজারো মানুষের একসাথে ইফতারের দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত হন মসজিদের খতিব সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল-মাদানী। এরপর তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছোট পরিসরে এই আয়োজন শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সহযোগিতা বাড়তে থাকে, আর ২০০১ সাল থেকে এটি নিয়মিত ও বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। বর্তমানে এটি চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ গণ-ইফতার আয়োজন হিসেবে পরিচিত।
এই আয়োজন অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের জন্যও বড় সহায়তা হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ এখানে এসে নিশ্চিন্তে ইফতার করতে পারেন। রিকশাচালক, দিনমজুর কিংবা পথচলতি অনেক মানুষ এখানে এসে বসেন অন্য সবার সঙ্গে একই কাতারে। অনেকের জন্য এটি শুধু ইফতার নয়, বরং সম্মান ও সমতার অনুভূতিরও এক বিশেষ মুহূর্ত।
এই বিশাল আয়োজন পরিচালিত হয় সম্পূর্ণভাবে মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনুদানে। কেউ ছোলা দেন, কেউ চাল বা ডাল, কেউ আবার আর্থিক সহায়তা করেন। অনেকেই নীরবে দান করেন, নাম প্রকাশ করতে চান না। আন্দরকিল্লা ও খাতুনগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ীরা নিয়মিতভাবে এই আয়োজনকে সহযোগিতা করে আসছেন। মসজিদের গুদামে সংরক্ষণ করা হয় এসব উপকরণ, যেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিদিনের ইফতার প্রস্তুত করা হয়।
পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি শুধু ধর্মীয় কেন্দ্রই নয়, এটি ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব-এর নির্দেশে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ সালে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ মসজিদটির তত্ত্বাবধান করছে।
সাড়ে তিন শতাধিক বছরেরও বেশি পুরোনো এই মসজিদ আজ শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়; এটি মানবিকতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। রমজানের প্রতিটি বিকেলে যখন হাজার হাজার মানুষ একই সারিতে বসে আজানের অপেক্ষা করেন, তখন মনে হয়—সমতার সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলোর একটি যেন আঁকা হচ্ছে এই আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদের মেঝেতেই।