নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) চট্টগ্রাম সার্কেলের অধীন চলমান একাধিক মেগা প্রকল্প ঘিরে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সাথে যোগসাজশে ভুয়া বিল-ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাপক কমিশন বাণিজ্য এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের হাজার কোটি টাকা লোপাটের মূল হোতা হিসেবে আঙুল উঠেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) খ. ম. জুলফিকার তারেকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ কানাডার ‘বেগমপাড়ায়’ পাচার করার মতো গুরুতর অভিযোগ এনে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এক সচেতন নাগরিক।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপকূলীয় পোল্ডার পুনর্বাসন প্রকল্প, নদী তীর সংরক্ষণ এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ (বেজা) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দেদারসে অনিয়ম চলছে। বিশেষ করে পতেঙ্গা, আনোয়ারা, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান ও সন্দ্বীপে বাঁধ নির্মাণ ও নদী ভাঙন রোধে ব্যবহৃত সিসি ব্লক, কংক্রিট, রড, পাথর এবং বালুভর্তি জিওব্যাগের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলে, নির্মাণাধীন বা সদ্য সমাপ্ত প্রকল্পগুলো সামান্য পানির চাপেই তলিয়ে যাচ্ছে, যা কাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্বকে চরম প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অভিযোগে প্রকাশ, বিগত ১৫ বছর ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি করে চলছেন প্রকৌশলী জুলফিকার তারেক। প্রকল্প এলাকায় তদারকির অভাব এবং কাজের মানের চেয়ে বিল উত্তোলনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেট শত শত কোটি টাকা পকেটে পুরেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে জুলফিকার তারেকের বিদেশ ভ্রমণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে। দুদকে জমা পড়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে তিনি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ কানাডায় পাচার করেছেন এবং সেখানে ‘বেগমপাড়া’ এলাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ির মালিক হয়েছেন। সরকারি নিয়ম তোয়াক্কা না করে কোনো প্রকার নিয়মিত ছুটি ছাড়াই তিনি ঘন ঘন কানাডায় যাতায়াত করেন, যা তাঁর পাসপোর্ট রেকর্ড পরীক্ষা করলেই স্পষ্ট হবে বলে অভিযোগকারী উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, পটিয়ার প্রকল্প ঘিরে ভূমি অধিগ্রহণের নামে প্রকৃত জমির মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ না দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এর মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।
এসব গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতি ও দুদকের অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খ. ম. জুলফিকার তারেকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি “মিটিংয়ে আছেন” বলে সংযোগটি কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কাগজে-কলমে চলা এই ‘হরিলুট’ বন্ধে এবং জড়িত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদকের চেয়ারম্যানের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও বাপাউবো সংশ্লিষ্টরা।