অবক্ষয়ের মুখে যুবসমাজ, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
বিশেষ প্রতিনিধি:
বিগত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আকস্মিকভাবে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ এক নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অনৈতিক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন। দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগ বা অবদান ছাড়াই রাতারাতি ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেওয়া শাহেদুল মোস্তফা নামের ওই নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, বনভূমির জায়গা দখল ও আবাসিক হোটেলের আড়ালে দেহ ব্যবসা পরিচালনার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত ১৫ বছর দলের দুঃসময়ে চরম ত্যাগ স্বীকার করা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে গত ৫ আগস্টের পর ক্ষমতার দাপটে পদটি বাগিয়ে নেন শাহেদুল মোস্তফা। নেতা হওয়ার পর থেকেই তিনি এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, অন্যের জমি দখল, সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও বিভিন্ন খাত থেকে চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছেন। এমনকি বনবিভাগের কর্মকর্তাদের হুমকি-ধমকি দিয়ে বনের জায়গা দখল ও গাছ কাটার মতো অপকর্মের হোতা হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে। তার এসব কর্মকাণ্ডে খোদ দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরাও চরম হতবাক ও ক্ষুব্ধ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শাহেদুল মোস্তফার মালিকানাধীন একটি মার্কেটের চতুর্থ তলা ‘হোটেল আল ফরিদ’ নামে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই আবাসিক হোটেলের আড়ালে মূলত পতিতালয় ও জমজমাট দেহ ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। কেবল অনৈতিক ব্যবসাই নয়, হোটেলটি অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে অভিযান চালিয়ে এই হোটেল থেকে ১৬ জন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যৌনকর্মীকে আটক করেছিল চকরিয়া থানা পুলিশ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৪ জুন এই ‘হোটেল আল ফরিদ’ থেকেই অস্ত্রসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, যে মার্কেটের হোটেলে এই অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে, ঠিক একই ভবনে শাহেদুল মোস্তফা তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কার্যালয় (অফিস) বানিয়ে নিয়মিত বসছেন। একজন দায়িত্বশীল দলীয় নেতার ছত্রছায়ায় এমন অপরাধের আখড়া চলায় এলাকার যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
এদিকে, এতসব গুরুতর অপরাধ ও পুলিশের খাতায় রেকর্ড থাকার পরও শাহেদুল মোস্তফা তার প্রয়াত পিতার প্রতিষ্ঠিত একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি মনোনীত হয়েছেন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে এই মনোনয়ন দেওয়া হয়। একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও অনৈতিক-অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তি কীভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হন, তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড কোনো ধরনের খোঁজখবর বা ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করে কীভাবে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন বিএনপির একাধিক প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
”বিগত ১৭ বছর আমরা মামলা-হামলার শিকার হয়েছি, আর ৫ আগস্টের পর উড়ে এসে জুড়ে বসা শাহেদুল মোস্তফা আমাদের ঘাড়ে চড়ে বসেছেন। তার এসব চাঁদাবাজি, বনের জায়গা দখল আর অস্ত্রধারী-পতিতালয় ব্যবসার কারণে বিএনপির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
তারা অবিলম্বে এই বিতর্কিত কমিটি বিলুপ্ত করার এবং শাহেদুল মোস্তফাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গা থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, যেন দ্রুত এই ‘হাইব্রিড’ নেতার হাত থেকে এলাকা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা যায়।