তাপস বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এলএনজি) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় নগরের বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনগুলোর কার্যক্রমেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে নগরের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
রোববার দুপুরে নগরের কদমতলীর ফোর স্টার সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাকলিয়ার কর্ণফুলী ফিলিং স্টেশন এবং মাইজ্জারটেক এলাকার কয়েকটি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের।
কদমতলীর একটি সিএনজি স্টেশনে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ কাফিল উদ্দিন। তিনি বলেন, আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস পাওয়া যেত। কয়েক দিন ধরে অপেক্ষার সময় বাড়লেও আজ পরিস্থিতি আরও খারাপ। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থেকেও কখন গ্যাস মিলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত কেজিডিসিএল পেয়েছে প্রায় ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস, যেখানে দৈনিক চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সরবরাহ আরও কমে ২০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। হালিশহরের বাসিন্দা নাসরিন আক্তার জানান, কয়েক দিন ধরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। সন্ধ্যার পর এলেও চাপ এত কম থাকে যে রান্না করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় গভীর রাতে সামান্য গ্যাস পাওয়া যায়। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং অন্যান্য বৃহৎ গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে কেজিডিসিএল। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটের পরিবর্তে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট, সার কারখানায় ৪৮ মিলিয়নের পরিবর্তে ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ইউনাইটেড পাওয়ারে ১৩ মিলিয়নের পরিবর্তে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
পতেঙ্গা, ইপিজেড, কালুরঘাট, অক্সিজেন ও সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় বয়লার ও জেনারেটর পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ওয়াশিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক মো. রকি উদ্দিন রিপন বলেন, ওয়াশিং কারখানাগুলো পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর। শনিবার রাত থেকে কার্যত গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ মেশিন বন্ধ রাখতে হয়েছে। সকাল ১০টার পর সামান্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদন সম্ভব হয়নি। তাঁর কারখানার ছয়টি মেশিনের মধ্যে মাত্র দুটি চালানো গেছে। উৎপাদন সক্ষমতার ৩৫ শতাংশের বেশি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের প্রায় ৫০টি ওয়াশিং কারখানাই একই সংকটে রয়েছে।
বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ইস্পাত শিল্পও চাপে পড়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে বিকল্প হিসেবে তেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু তেলের খরচ বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারমূল্যের ওপরও পড়তে পারে।
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। দৈনিক চাহিদা ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ সেই তুলনায় অনেক কম। তাই সব খাতে ন্যূনতম সরবরাহ নিশ্চিত করতে কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্যাস বন্ধ রাখা কিংবা চাপ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, সংকটের মূল কারণ মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ড। টার্মিনালের দুটি বয়লারের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমস্যার সমাধানে কাজ করছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।