বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আনস্টাফিং (পণ্য খালাস) কার্যক্রমে কতিপয় কর্মকর্তার ঘুষ বাণিজ্য, ফাইল আটকে রেখে চরম হয়রানি এবং কৃত্রিম জটিলতা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস কেন্দ্রিক এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে নাম এসেছে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার (এসি) ওমর কাউসার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) সুমন কান্তি বিশ্বাসের।
অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের (জেটি) আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৫-২০ দিনের মাথায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এসি ওমর কাউসার। এই বাণিজ্যে সরাসরি সহায়তার অভিযোগ রয়েছে এমবিবি আনস্টাফিং গেটের রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রাম বন্দরে পিসিটিসহ মোট ৫টি আনস্টাফিং গেইট রয়েছে। প্রাপ্ত গোপন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেট প্রতি গেইট থেকে সপ্তাহে প্রায় দেড় লাখ (১,৫০,০০০) টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় করছে। প্রতিটি কমার্শিয়াল পণ্য ছাড় করতে হলে এসি ওমর কাউসারের সরাসরি অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে।
ফলে গেটের দায়িত্বে থাকা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের (এআরও) ওপর চাপ প্রয়োগ করে ফাইল এসি অফিসে পাঠানো হয়। সিএন্ডএফ কর্মচারীরা ফাইল নিয়ে গেলে ‘পণ্য ভালো করে দেখতে হবে’ বা ‘আগামীকাল ইনডেন্ট দেন’—এমন নানা অজুহাতে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাস্টমসের এক সিপাহী জানান, এমবিবি আনস্টাফিং গেটের (আরও) সুমন কান্তি বিশ্বাস প্রতিদিন এসি ওমর কাউসারের কার্যালয়ে যান এবং সিএন্ডএফ কর্মচারীদের কীভাবে ফাইল আটকে রেখে কোণঠাসা করা যায়, তার দিকনির্দেশনা দেন।
এক দিন কন্টেইনার আটকে থাকলে পোর্ট ডেমারেজ ও অন্যান্য খরচে ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়। বন্দর ও কাস্টমসের এই অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতি এবং হয়রানির ভয়ে শেষ পর্যন্ত ঘুষ দিতে বাধ্য হন সিএন্ডএফ প্রতিনিধিরা। ফলে স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবসার পরিবেশ পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাধারণ ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ এজেন্ট কর্মচারীরা এই পরিস্থিতিতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের বক্তব্য:
“চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ব্যবসার পরিবেশ এখন পুরোপুরি জিম্মি! সামান্য কমার্শিয়াল পণ্য ছাড় করতে গেলেও এসি অফিসে দৌড়াতে হয়। ডেমারেজের ভয় দেখিয়ে কাস্টমসের এই সিন্ডিকেট প্রতিনিয়ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিটি গেট থেকে যে হারে অর্থ আদায় চলছে, তাতে ব্যবসার স্বাভাবিক গতি নষ্ট হচ্ছে। আমরা অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের অবসান এবং স্বচ্ছ তদন্ত চাই।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কাস্টমস কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সহকারী কমিশনার (এসি) ওমর কাউসার বলেন:
“আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কাস্টমসের রাজস্ব ফাঁকি রোধে এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা বজায় রেখে পণ্য খালাসে নজরদারি বাড়ানোতেই একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) সুমন কান্তি বিশ্বাস দাবি করেন:
“এখানে সব নিয়ম মেনেই কাজ করা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
কাস্টম হাউসের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন:
“চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে অনিয়ম বা ব্যবসায়ীদের অহেতুক হয়রানি করার কোনো সুযোগ নেই। সহকারী কমিশনার ওমর কাউসার ও রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং সত্যতা মিললে কঠোর আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ব্যবসায়ীরা জানান, বন্দর ও কাস্টমসের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ফেরাতে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
ঘুষ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর অডিও-ভিডিও কল রেকর্ড ও অনুসন্ধানী তথ্যের প্রমাণসহ ২য় পর্ব দেখতে চোখ রাখুন আগামী সংস্করণে।