বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অভিযোগ, ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি, পদায়ন কিংবা নির্ধারিত বদলি ঠেকানোর সুযোগ মিলছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আরএনবির চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্যের ভাষ্য, আরএনবিতে বদলি এখন অনেক ক্ষেত্রে নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি পরিণত হয়েছে ‘আর্থিক সমঝোতার’ বিষয়ে। পছন্দের স্টেশনে যেতে কিংবা নির্ধারিত বদলি বাতিল করতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয় বলে অভিযোগ তাঁদের। তবে প্রতিশোধমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা বা হয়রানির আশঙ্কায় নাম প্রকাশ করে কথা বলতে অনিচ্ছুক অনেক সদস্য।
জহিরুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে চীফ কমান্ড্যান্ট হিসেবে যোগ দেওয়ার পর গত কয়েক মাসে আরএনবিতে বিপুলসংখ্যক বদলি ও পদায়ন হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বদলি ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
জানুয়ারিতেই দফায় দফায় বদলি
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একাধিক দফায় আরএনবি সদস্যদের বদলি করা হয়। ৫ জানুয়ারি তিনজন, ১৮ জানুয়ারি তিনজন, ২১ জানুয়ারি চারজন এবং ২৬ জানুয়ারি চারজন সিপাহিকে বদলি করা হয়। এসব বদলির কয়েকটির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সদস্যদের।
অভিযোগকারীদের দাবি, পছন্দের কর্মস্থলে বদলি পেতে কিংবা বদলি ঠেকাতে কখনো ৩০ হাজার, আবার কখনো কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের কথা তাঁদের কাছে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ছয় মাসেই বদলি, এক বছর না পেরোতেই কর্মস্থল পরিবর্তন
আরএনবির সাম্প্রতিক কয়েকটি বদলি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সিপাহি সুমন দাশ গুপ্ত আরএনবির গোয়েন্দা শাখায় যোগ দেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি হয়েছেন।
একইভাবে মীর হোসাইনকে ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়। এক বছরের কিছু বেশি সময় পর ২০২৬ সালের ১৪ জুন তাঁকে আবার লাকসামে বদলি করা হয়। এই বদলির পেছনেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশনে যোগ দেওয়া আনন্দ বড়ুয়াকেও এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই চলতি বছরের ৯ জুন পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়। নির্ধারিত কর্মস্থলে ন্যূনতম দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার আগেই কেন এসব বদলি— এ নিয়ে আরএনবির সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
টাকা নিয়ে আবার ফেরত দেওয়ার অভিযোগ
বদলি, পদোন্নতি, র্যাংক ব্যাজ কিংবা চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার পর কয়েকজনকে টাকা ফেরত দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোমিন, বেলাল, আল-আমিন, ওয়াদুদ, তুহিন ও প্রশন্নকে কোনো এক পর্যায়ে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ ফেরতের ঘটনাগুলোর সঙ্গে চীফ কমান্ড্যান্টের দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেনের নামও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি, বিষয়টি মীমাংসায় তিনি সহযোগিতা করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আরএনবির চীফ কমান্ড্যান্ট অভিযুক্ত মো. জহিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
চীফ কমান্ড্যান্টের দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেনের সঙ্গে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে নেওয়া অর্থ ফেরতের বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তায় যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য না দিয়ে তিনি চায়ের দাওয়াত দেন।
ইন্সপেক্টর বদলিতেও অর্থের অভিযোগ
পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে বদলি হয়ে আসার সময় কয়েকজন ইন্সপেক্টরের কাছ থেকেও বদলি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
এমনকি পূর্বাঞ্চলে ইন্সপেক্টর পদে শূন্যতা না থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ইন্সপেক্টর মনির হোসেন রাহাতকে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পূর্বাঞ্চলে পদায়নের গুঞ্জনের কথাও তাঁরা জানিয়েছেন।
পুরোনো অভিযোগও ফিরছে আলোচনায়
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে বদলি করা হলে আরএনবি সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তখন কয়েকজন সদস্য পুরোনো পাওনা কিংবা কথিত ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। সেই সময়ের অভিযোগগুলোর সঙ্গে বর্তমান অভিযোগের মিল থাকায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
১৮৫ সিপাহি নিয়োগ মামলাও রয়েছে
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে নথিভুক্ত বিষয়গুলোর একটি হলো আরএনবিতে ১৮৫ সিপাহি নিয়োগে অনিয়মের মামলা।
২০১৭ সালের ওই নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শেষে ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। মামলায় তাঁকে নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে আসামি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছিল। ওই মামলার পাশাপাশি জহিরুল ইসলামের সম্পদের বিষয়েও দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান চালায়।
অনুসন্ধানে জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহারের নামে প্রায় সোয়া চার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে মিরপুরের সেনপাড়া মৌজায় বাড়িতে অংশীদারত্ব, ঢাকার শহীদবাগ ও উত্তরা এলাকায় ফ্ল্যাট এবং একটি গাড়ির তথ্যের কথা বলা হয়। তাঁর স্ত্রীর নামেও কুমিল্লা ও ঢাকায় একাধিক সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা অনুসন্ধানে উঠে আসে।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বদলি ঠেকানোর অভিযোগ
জহিরুল ইসলামের বদলি ঠেকাতে তাঁর ভাই আমিনুল ইসলাম সুজন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সুজন ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে জহিরুল ইসলাম নিজের বদলি ঠেকিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাকরিজীবনের শুরু সাঁটমুদ্রাক্ষরিক পদে
জহিরুল ইসলাম ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম টাইপিস্ট পদে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে পদোন্নতি পান। ২০০২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ২১তম বিসিএসের নন-ক্যাডার হিসেবে সহকারী কমান্ড্যান্ট পদে যোগ দেন। ২০০৬ সালে কমান্ড্যান্ট এবং ২০২০ সালে চীফ কমান্ড্যান্ট পদে দায়িত্ব পান।
আরএনবির সদস্যদের একাংশের প্রশ্ন— একই কর্মকর্তাকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্য, পদায়ন, নিয়োগ অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বারবার সামনে আসার পরও কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না কেন?
অভিযোগগুলোর বিষয়ে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।