বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সাবেক মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মণি লাল দাশের বিরুদ্ধে ওঠা ভুয়া সনদে চাকরি বাগানো, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দুর্নীতিলব্ধ অর্থ ভারতে পাচারের গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। বছরের পর বছর ধরে এসব অনিয়ম নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ চললেও কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিপিসির চেয়ারম্যানসহ নীতি-নির্ধারকদের সততা ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ করপোরেশনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সম্প্রতি (১৩ আগস্ট ২০২৬) অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়া এই কর্মকর্তার দুর্নীতি আড়াল করতে ইতিমধ্যে দপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব করারও মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।
বিপিসির প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত সহকারী ম্যানেজার (এমআইএস) পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’তে স্নাতক পাস চাওয়া হয়েছিল। তবে মণি লাল দাশের স্নাতকের ফল ছিল ‘তৃতীয় শ্রেণি’, যা আবেদন করার ন্যূনতম শর্ত পূরণ করত না। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ব্যাকডোর দিয়ে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি বিপিসিতে যোগ দেন। এর পর অদৃশ্য ক্ষমতার বলে তিনি একের পর এক পদোন্নতি পেয়ে মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডের (এসএওসিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদ বাগিয়ে নেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে মণি লাল দাশ ও তার স্ত্রী সেপিকা দাশের নামে আড়াই কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মণি লাল দাশ: অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মণি লাল দাসের ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার টাকার মোট সম্পদের বিপরীতে বৈধ আয় পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার টাকা। অবশিষ্ট ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।
সেপিকা দাশ (স্ত্রী): একজন সাধারণ গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর অবৈধ অর্থ বৈধ করতে নিজেকে কমিশন ব্যবসায়ী ও মৎস্য চাষী হিসেবে দেখিয়ে কর নথি খোলেন সেপিকা দাশ। দুদকের অনুসন্ধানে মাছ চাষ বা ব্যবসার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। তার ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার টাকার অর্জিত সম্পদের বিপরীতে ১ কোটি ৮৭ লাখ ১৭ হাজার টাকার উৎস মেলেনি।
দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ অনুসন্ধান শেষে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করে সম্প্রতি কমিশনে রিপোর্ট দাখিল করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্টে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মণি লাল আরও বেপরোয়া অনিয়ম চালিয়ে যান, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষতিসাধন হয়েছে। সংগৃহীত অবৈধ অর্থ তিনি প্রতি বছর একাধিকবার ভারত সফরের মাধ্যমে পাচার করেছেন বলে দাবি তাদের। মামলা ও তদন্তের ভয়ে তিনি অবসরে যাওয়ার ঠিক আগে নিজের পদোন্নতি ও নিয়োগ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইল গায়েব করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীলরা নিশ্চিত করেছেন।
এই সব অভিযোগের বিষয়ে মণি লাল দাশের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বার্তা পাঠিয়েও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দ্রুত কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে দুর্নীতির মূল নথি চিরতরে হারিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সাধারণ কর্মকর্তারা।