বিশেষ প্রতিনিধি | চট্টগ্রাম
কাগজে-কলমে উন্নয়ন দেখানো হয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। মাঠে গিয়ে দেখা গেল—নালা নেই, অবকাঠামো নেই, পানিও নেই। অথচ শত কোটি টাকার ভূতুড়ে বিল-ভাউচার বানিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে সরকারি টাকা। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ বিভাগের অধীন পরিচালিত ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে’ এমনই ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, টেন্ডার সিন্ডিকেট, নিম্নমানের কাজ এবং ভূতুড়ে কোটেশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধান শুরুর মুখে নতুন প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক এক ঘণ্টা আগে দপ্তর ছেড়ে পালিয়েছেন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত প্রকল্প পরিচালক (পিডি)।
কাজ না করেই ১০০ কোটেশনে কোটি কোটি টাকার বিল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন মেয়াদে একনেকে অনুমোদিত ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় অঞ্চলের পানির সংকট দূর করা। ৮০ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এনে প্রতি বছর অতিরিক্ত ১ লাখ টন ফসল উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চট্টগ্রাম জোন, দোহাজারী, রাউজান, মিরসরাই ও হাটহাজারী জোনে কোনো অবকাঠামোগত কাজ না করেই অন্তত ১০০টি কোটেশন দরপত্র দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ভুয়া বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের সঙ্গে যোগসাজশে পিডি নুরুল ইসলাম ও পছন্দের ঠিকাদার সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়।
সিন্ডিকেটের পকেটে টাকা, কৃষকের সেচ স্বপ্ন ধূলিসাৎ
প্রকল্পের অধীনে সৌরচালিত ডাগওয়েল, খাল পুনঃখনন, পাম্প হাউজ নির্মাণ, সোলার পাম্প ও বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজই করা হয়নি। যেটুকু করা হয়েছে, তাও অত্যন্ত নিম্নমানের। পিডির নিজস্ব সিন্ডিকেটের মেসার্স শেখ আনাছ, এম.আর.এস. বিপ্লব, ম্যাক্স ওয়েল, সেবা এন্টারপ্রাইজ, সাদিক এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সিনহা এন্টারপ্রাইজ এবং এ রহমান এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে টেন্ডার ও কোটেশন হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ নিজেই ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ হিসেবে কাজ পরিচালনা করেছেন।
অফিস ছেড়ে চম্পট বিতর্কিত পিডি
অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় গত ২১ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের আদেশে রাঙ্গামাটি সেচ রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাহেদকে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে কালুরঘাটস্থ বিএডিসি চট্টগ্রাম সার্কেল অফিসে দায়িত্ব নিতে যান নতুন পিডি। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর ঠিক এক ঘণ্টা আগে কার্যালয় থেকে পালিয়ে যান বিদায়ী পিডি নুরুল ইসলাম।
যোগাযোগের জন্য একাধিকবার কল ও হোয়াটসঅ্যাপে চিঠি পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। জানা গেছে, বদলি ঠেকাতে এবং নতুন টেন্ডারের সুবিধা নিতে তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারে দৌড়ঝাঁপ করছেন। উল্লেখ্য, এর আগেও ২০২১ সালে ভবন নির্মাণে অনিয়মের কারণে চার মাসের মাথায় তাঁকে হবিগঞ্জে বদলি করা হয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে ৩৬টি খাতে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছিল তদন্ত কমিটি।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু
গণমাধ্যমে বিএডিসির অনিয়মের চিত্র উঠে আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি আমলে নিয়েছে। দুদকের একটি অনুসন্ধান টিম ইতোমধ্যেই প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ, পিডি নুরুল ইসলাম এবং বিএডিসির অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। বিএডিসির উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তাই এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
উপকূলীয় এলাকার কৃষকরা যখন পানির তীব্র সংকটে ভুগছেন, তখন সরকারি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা হরিলুটের এই ঘটনা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।