কক্সবাজার প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত হওয়া এক প্রেমিক যুগলের ওপর চকরিয়া থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আরকানুল ইসলামের নেতৃত্বে বর্বর ও নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুবকের বাড়ি থেকে তরুণীকে জোরপূর্বক উদ্ধার করতে গিয়ে এসআই আরকানুল ও তার সাথে থাকা পুলিশ সদস্যরা দুজনকে বেধড়ক লাঠিপেটা করেন।
পুলিশের এই নির্মম পিটুনিতে গুরুতর আহত যুবক মারা গেছেন—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা পুলিশের ব্যবহৃত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর করে এবং পুলিশকে ধাওয়া দেয়। শনিবার (৩০ মে) বিকেল ৫টার দিকে চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
বিয়ের সিদ্ধান্তের পরেই এসআই আরকানুলের হানা
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঈদগাঁও উপজেলার এক তরুণী চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকার নুরুল আমিনের (২৪) সাথে প্রেমের সম্পর্কের জেরে গত শুক্রবার পালিয়ে আসেন।
নুরুল আমিনের মা জানান,
”মেয়ের মা ও বাবা গতকাল শুক্রবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। উভয় পরিবারের সম্মতিতে দেনমোহর নির্ধারণ করে তাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত মেয়েপক্ষের কয়েকজনের পছন্দ না হওয়ায় তারা চকরিয়া থানায় একটি সাজানো অভিযোগ দায়ের করেন।”
এই অভিযোগের সূত্র ধরে শনিবার বিকেলে প্রথমে চকরিয়া থানা পুলিশের একটি দল মেয়েটিকে উদ্ধার করতে যায়। কিন্তু তরুণীটি স্বেচ্ছায় চকরিয়ায় আসায় পুলিশের সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স নিয়ে হাজির হন এসআই মো. আরকানুল ইসলাম।
এসআই আরকানুলের তাণ্ডব ও নৃশংসতা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছেই এসআই আরকানুল ইসলাম কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত উগ্র রূপ ধারণ করেন। মেয়েটি যেতে রাজি না হওয়ায় এসআই আরকানুলের সরাসরি নির্দেশে ও নেতৃত্বে পুলিশ লাঠিপেঠা শুরু করে।
একপর্যায়ে প্রেমিক নুরুল আমিনকে পুলিশ নির্মমভাবে পেটাতে থাকলে তাকে বাঁচাতে প্রেমিকা জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু এসআই আরকানুলের নির্মমতা থেকে রেহাই মেলেনি কারও। মেয়েটিকে টেনেহিঁচড়ে এবং নুরুল আমিনকে মাটিতে ফেলে বুক ও মাথায় বেধড়ক আঘাত করা হয়। এসআই আরকানুল ও তার সঙ্গীয় ফোর্সের এই নৃশংস পিটুনিতে স্থানীয় নুরু মাঝির ছেলে নুরুল আমিন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
গণধোলাইয়ের মুখে পুলিশ, এলাকায় রণক্ষেত্র
মুহূর্তের মধ্যে নুরুল আমিনের নিথর দেহ দেখে তিনি মারা গেছেন বলে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে পুরো এলাকার হাজার হাজার মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। উত্তেজিত এলাকাবাসী এসআই আরকানুল ইসলামসহ পুলিশ সদস্যদের ওপর চড়াও হন এবং ধাওয়া দেন। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের ব্যবহৃত একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে খবর পেয়ে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেয়।
আহত যুবক চমেক হাসপাতালে, তদন্তের আশ্বাস
এদিকে নুরুল আমিনের পরিবারের দাবি, এসআই আরকানুলের মারধরে মারাত্মক জখম হওয়া নুরুল আমিনকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে প্রথমে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
অভিযানের নামে এই বর্বরতার বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অভিজিৎ দাশ জানান, একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে উদ্ধার করতে গেলে ঘটনার সূত্রপাত হয়।
এসআই আরকানুল ইসলামের এই অতিউৎসাহী ও সহিংস ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন,
”ভিকটিম উদ্ধারের এই অভিযানে পুলিশের কোনো সদস্যের গাফিলতি, অতিউত্সাহ বা দোষত্রুটি প্রমাণিত হলে তাকেও কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হবে।”
বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা এসআই আরকানুল ইসলামের দ্রুত বরখাস্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন