নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) তার কোনো পদ নেই, নেই কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বও। অথচ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন দপ্তরে ছিল তার অবাধ যাতায়াত। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি এই সংস্থার করিডোরকে তিনি ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার ও তদবিরের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরিচয়ের নানা মুখোশকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালাতেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কখনও নিজেকে সাংবাদিক, কখনও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ, কখনও মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিচিত এবং সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করতেন ইমরান হাসান। সিডিএ সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বিভিন্ন পরিচয়ের আড়ালে প্রভাব বিস্তারের কৌশল।
অভিযোগ রয়েছে, সিডিএর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বহুতল ভবনের নকশা (প্ল্যান) অনুমোদন, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক নানা বিষয়ে কোনো ধরনের দায়িত্বে না থেকেও তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে হস্তক্ষেপ করতেন। প্রায় প্রতিদিনই তাকে সিডিএর গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে দেখা যেত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিডিএ সূত্রগুলোর দাবি, তিনি প্রথমে বিভিন্ন ভবনের বিরুদ্ধে ভুয়া বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ দাখিল করতেন। পরে সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অভিযোগ প্রত্যাহার কিংবা নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়ে ভবন মালিকদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, বিজয় কিসান গ্রুপ, গোপীনাথ গ্রুপ, সজল গ্রুপসহ একাধিক আলোচিত ভবন প্রকল্পকে কেন্দ্র করেও তিনি একই ধরনের তৎপরতা চালিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নকশা-সংক্রান্ত অনিয়ম ও তদবির বাণিজ্যের নেপথ্যে সক্রিয় ছিলেন ইমরান হাসান। তার দাবি অনুযায়ী কাজ না হলে তিনি নিজেই বাদী হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সিডিএ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একের পর এক লিখিত অভিযোগ পাঠাতেন। সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা জানান, তার এই তথাকথিত ‘চিঠি বাণিজ্য’ দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তাদের জন্য হয়রানি ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।
সূত্র জানায়, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি নতুন পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এ সময় তিনি নিজেকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের খালাতো ভাইয়ের ছেলে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মহলে তদবির ও সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইমরান হাসানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালী থানায় একটি এবং চকবাজার থানায় দুটি মামলা রয়েছে। এছাড়া জুলাই বিপ্লব-সংশ্লিষ্ট একটি হত্যা মামলায় ৬২ নম্বর আসামি হিসেবেও তার নাম রয়েছে। তবে এসব মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
এর আগে ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর সিডিএ কার্যালয়ে দালালি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক ঘটনায় তিনি প্রকাশ্যে মারধরের শিকার হন। ঘটনাটি সে সময় সিডিএ অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইমরান হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।