বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: সংবাদমাধ্যমে তোলপাড়, একের পর এক প্রশাসনিক কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ)—কোনো কিছুই থামাতে পারছে না চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের করেরহাট বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তা মো. আলাল উদ্দিনকে। একের পর এক অভিযোগ উঠলেও উল্টো দ্বিগুণ উৎসাহে চলছে বনাঞ্চল ধ্বংস ও প্রকাশ্য চাঁদাবাজির মহোৎসব। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওপর মহলের নীরব ছত্রছায়ায় সংরক্ষিত বনের ভেতর ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন থেকে শুরু করে কাঠ পাচার ও বনের জমি বিক্রির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, করেরহাট রেঞ্জ অফিসের ঠিক পেছনে সীতাকুণ্ড-রামগড় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বটতলী, ‘চিকন ছড়া’, কয়লা ও ঝিলতলী এলাকায় দিন-রাত সমান তালে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। বনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য তোয়াক্কা না করে বসানো হয়েছে শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি ড্রেজার মেশিন থেকে নিয়মিত ৫০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছেন বিট কর্মকর্তা আলাল উদ্দিন। মিরসরাই উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার অভিযান চালিয়ে এসব ড্রেজার জব্দ করলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বনের বুক চিরে তোলা অবৈধ বালু যখন করেরহাট চেক স্টেশন পার হয়, তখনো প্রতি গাড়ি থেকে নির্দিষ্ট হারে গুণতে হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা।
আলাল উদ্দিনের এই লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন করেরহাট রেঞ্জের কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মাহদী হাসান। বনাঞ্চলের কাঠ পাচার, অবৈধভাবে জায়গা বিক্রি ও বালু উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আলালকে এ পর্যন্ত রেকর্ড ৭ বার কৈফিয়ত তলব (শোকজ) করা হয়।
তবে সূত্রের খবর, শোকজ নোটিশ পাওয়ার পর অফিসে সহকর্মীদের সামনেই দাম্ভিকতার সাথে আলাল মন্তব্য করেন—“এই এসিএফ আমার লোম ছেঁড়ার যোগ্যতাও রাখে না!”
সহকারী বন সংরক্ষক একের পর এক নোটিশ দিলেও চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই কর্মকর্তা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
করেরহাট এলাকার ভুক্তভোগী অধিবাসীদের ক্ষোভের আগুনে এখন ফুসছে পুরো এলাকা। তাদের মতে, করেরহাট স্টেশন থেকে প্রতি মাসে যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আয় হয়, তার ভাগ পৌঁছে যায় অদৃশ্য বিভিন্ন পকেটে। ফলে স্টেশনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠে কোনো দায়িত্ব পালন না করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বা বাসায় বসে অলস সময় পার করছেন।
অন্যদিকে, বন পাহারার নামে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে মাসভিত্তিক চাঁদা আদায়কারী একদল দালাল, যাদের বনের ভাষায় বলা হয় ‘ফ্রিম্যান’।
এই ‘ফ্রিম্যান’ বাহিনী সংরক্ষিত বনের মূল্যবান জায়গা ঘরবাড়ি বানানোর জন্য সাধারণ মানুষের কাছে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করছে।
বনের হাজার হাজার টাকার সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করে সেই টাকা জমা হচ্ছে অফিসে।
পরিবেশবিদ ও পর্যবেক্ষক মহলের মতে, করেরহাট বিট ও চেক স্টেশন এলাকার অবশিষ্ট বনভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে দুর্নীতিতে রেকর্ড সৃষ্টিকারী এই বন কর্মকর্তা আলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে অপসারণ ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ঐতিহাসিক এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল অচিরেই কেবল মানচিত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।