বিশেষ সংবাদদাতা:
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি পিএলসির সাবেক মহাব্যবস্থাপক (এমডি) মো. মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিটুমিন সরবরাহে গ্রাহককে হয়রানি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসির পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হককে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মোহাম্মদ ইমাম হোসেন এবং ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. ইসতিয়াক হোসেন।
বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বিটুমিন সরবরাহ নিয়ে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আকাশি প্রভাব ও সিণ্ডিকেট পরিচালনা
যমুনা অয়েলে মাসুদুল ইসলাম ছিলেন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তিনি একসাথে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ—মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ), মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) এবং কোম্পানি সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বিটুমিন সরবরাহ কমিটির আহ্বায়কের পদেও ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহির সাথে একই গ্রামের বাড়ি এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার সুবাদে তিনি এই অভূতপূর্ব প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এক দুর্নীতিবাজ সিণ্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে যমুনা অয়েলের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও তৎকালীন কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পদোন্নতি দেয়।
দুর্নীতিগ্রস্তদের সুরক্ষা ও পদোন্নতির চেষ্টা
সম্প্রতি ফতুল্লা ডিপো থেকে প্রায় পৌনে চার লাখ লিটার ডিজেল গায়েবের ঘটনায় অভিযুক্ত এজিএম (অপারেশন-ডিপো) শেখ জাহিদ আহমেদ ও ডিপো ইনচার্জ মোহাম্মদ আসলাম খান আবু উলায়ীকে সাময়িক বরখাস্ত না করে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাঁদের পদোন্নতির সুপারিশ করার অভিযোগ ওঠে মাসুদের বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকা লিয়াজোঁ অফিসে অনুষ্ঠিত পদোন্নতি সভায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব আসমা আরা বেগম আপত্তি জানালে সেই পদোন্নতি স্থগিত হয়।
এছাড়া, ২০২০ সালের এপ্রিলে মংলা ডিপোর ২৯,৯২৫ লিটার তেল ক্ষতির ঘটনায় ডিজিএম (অ্যাকাউন্টস) হিসেবে চিঠি দিলেও গত পাঁচ বছরেও তার কোনো সুরাহা হয়নি। অভিযুক্ত ডিপো ইনচার্জ আনিসুর রহমানকে পরবর্তীতে বরিশাল ডিপোতে পদোন্নতি লাভে সহায়তা করেন মাসুদ। সিবিএ নেতাদের বদলিতে শ্রম আইনের ১৮৭ ধারার অজুহাত দিলেও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জ্বালানি খাতে এ আইন প্রযোজ্য নয়, যা তিনি চেপে যান।
অবৈধ সুবিধা ও শত কোটি টাকার সম্পদ
১৯৯৬ সালে চাকরির পর গাড়ি কেনার জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে দুইবার ঋণ নেন মাসুদ। দ্বিতীয়বারের ২০ লাখ টাকা গাড়ি না কিনে তিনি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন এবং বিষয়টি ফাঁস হলে এক বছর পর টাকা ফেরত দেন। বর্তমানে হালিশহরে নিজস্ব ফ্ল্যাট, সিইউডিএ বাকলিয়া প্রকল্পে দুটি প্লট (যার একটিতে বহুতল ভবন নির্মাণাধীন), বড় ডেইরি ফার্ম এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে নামে-বেনামে বিপুল শেয়ারসহ তিনি শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বলে জানা গেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের বিটুমিন সরবরাহে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগে গত ১৪ মে বিপিসির জরুরি নির্দেশে তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। সর্বশেষ বিপিসির এ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতির চ্যাপ্টার খতিয়ে দেখা হচ্ছে।