চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে বাগান সৃজনে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে দুদকে আবেদন
বন অধিদপ্তরের ‘সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা)’ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের কুমিরা রেঞ্জে বাগান সৃজনের নামে বরাদ্দ করা দেড় কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাগান সৃজন ও রক্ষণাবেক্ষণ না করেই বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। আবেদনে প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয়, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এবং সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বন কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা রাজধানীসহ তার নিজ এলাকায় প্রায় ৯ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এছাড়াও তার এক আত্মীয়র মাধ্যমে কানাডায় ৪ কোটি টাকা ব্যায়ে একটি বাড়ি করেছেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বন অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দেওয়া এক চিঠিতে কুমিরা রেঞ্জের বাগান সৃজনের অগ্রগতিতে গুরুতর অসংগতির তথ্য তুলে ধরেন। চিঠিতে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুফল প্রকল্পের আওতায় কুমিরা বিটে ১৭০ হেক্টর দ্রুত বর্ধনশীল বাগানের প্রথম জরিপ ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ওই জরিপে জীবিত চারাগাছের হার পাওয়া যায় ৬০ দশমিক ২০ শতাংশ, যেখানে কমপক্ষে ৮০ শতাংশ জীবিত চারাগাছ থাকার কথা।
একই রেঞ্জের ১০ হেক্টরের আরেকটি দ্রুত বর্ধনশীল বাগানে জীবিত চারাগাছের হার পাওয়া যায় মাত্র ৫০ দশমিক ৪০ শতাংশ। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় বাগান সৃজন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা চেয়েও অগ্রগতি নেই
আবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলামের কাছে লিখিতভাবে কুমিরা রেঞ্জের ৭০ ও ১০ হেক্টরের দুটি বাগান সৃজনে ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের নামের তালিকা সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষকের মাধ্যমে তাঁর দপ্তরে পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ওই তালিকা পাঠানো হয়নি বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগের সঙ্গে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম আলোচনায় এসেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডেপুটি রেঞ্জার সাদেকুর রহমান, উপবন সংরক্ষক এস এম কায়চার এবং সহকারী বন সংরক্ষক জয়নাল আবেদীনের নাম রয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য আবেদনে দেওয়া হয়নি। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া সাদেকুর রহমানের পদোন্নতি এবং পরবর্তী সময়ে কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা যাচাই করতে বলেছে আবেদনকারী।
আবেদনে বন বিভাগের বিভিন্ন মহলে প্রচলিত অভিযোগের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপা দিতে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে মূল অভিযুক্ত হিসেবে আলোচিত ডেপুটি রেঞ্জার সাদেকুর রহমানকে দায়ের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের উৎকোচ লেনদেনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীন তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুদকের কাছে দেওয়া আবেদনে প্রকল্পের অর্থ ছাড়, বিল-ভাউচার, মাপজোক, টেন্ডার ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বাগান সৃজনের রেকর্ড, মাঠ জরিপ প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বকালীন নথিপত্র যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করে অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধভাবে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা উদ্ধারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। আবেদনকারী আরও বলেছেন, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ও ২৬ নভেম্বর পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের জারি করা চিঠি, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন এবং দায় নির্ধারণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করে যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি সরেজমিনে বাগান পরিদর্শন করে প্রকল্পের নথিতে দেখানো বাগানের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, সরকারি অর্থ ও বনসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত। তাই অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা উম্মে হাবিবার বক্তব্য জানতে বার বার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।