চট্টগ্রামের কাঁচাবাজারে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজার। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। একই সঙ্গে ডিম ও মুরগির বাজারেও ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ পরিবারের রান্নাঘরে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা। অনেকেই বলছেন, আয় না বাড়লেও প্রতিদিনের খরচ যেন লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে।
শুক্রবার নগরের বহদ্দারহাট, চকবাজার, কাজীর দেউড়ি, দুই নম্বর গেইট ও আগ্রাবাদ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ সবজির দাম এখন ১০০ টাকার ওপরে। এক মাস আগেও যেসব সবজি ৫০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে সেগুলোর দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বেগুন, ঢেঁড়স, বরবটি, কাঁকরোল, পটল ও করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের কেজি ১৫০ টাকায় পৌঁছেছে, আর ধনেপাতা বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। শসা ও অন্যান্য মৌসুমি সবজির দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
বাজারে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হতাশা দেখা গেছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম পণ্য কিনে বাসায় ফিরছেন, আবার কেউ কেউ তালিকা থেকে একাধিক আইটেম বাদ দিচ্ছেন।
বহদ্দারহাট বাজারে বাজার করতে আসা স্কুলশিক্ষক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন,
“আগে ১৫০০ টাকায় পুরো সপ্তাহের বাজার হতো, এখন দুই দিনের বাজার করতেই সেই টাকা শেষ হয়ে যায়। প্রতিটি সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে গেলে সাধারণ মানুষ কীভাবে সংসার চালাবে বুঝি না।”
বহদ্দারহাট এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন,“ডিম, সবজি, মুরগি—সবকিছুর দাম একসঙ্গে বেড়েছে। এখন প্রতিদিন বাজারে গিয়ে হিসাব করতে হয়, কিছু না কিছু বাদ দিতেই হয়।”
কাজীর দেউড়ি বাজারে ক্রেতা আব্দুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক মাসে সবকিছু দ্বিগুণ হয়ে গেল, এটা কি স্বাভাবিক বাজার? দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ দেখি না।”
ক্রেতাদের অভিযোগ, উৎপাদন পর্যায়ে দাম এতটা না বাড়লেও মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে খুচরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। বাজার মনিটরিং দুর্বল হয়ে পড়ায় একটি অংশ ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, পাইকারি বাজার থেকেই দাম বাড়িয়ে আনা হচ্ছে, ফলে খুচরায় কিছু করার থাকে না। বহদ্দারহাট বাজারের সবজি বিক্রেতা মিজানুর রহমান বলেন,
“আমরা বেশি দামে কিনে আনি, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। আমাদের হাতে কিছুই থাকে না।”
চকবাজারের বিক্রেতা নুরুল আলম বলেন,“বৃষ্টি আর সরবরাহ কম থাকায় পাইকারি দাম বেড়েছে। খুচরায় আমরা সামান্য লাভে বিক্রি করছি, সিন্ডিকেটের কথা সব জায়গায় ঠিক না।”
ডিমের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায়, কোথাও কোথাও আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ডিম বিক্রেতা হাসান মিয়া বলেন,“খামার থেকে দাম বেড়েছে, খাদ্যের দামও বেশি। আমরা চাইলেও আগের দামে বিক্রি করতে পারি না।”
এদিকে মুরগির দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সোনালি মুরগি ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর দেশি মুরগির দাম ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় পৌঁছেছে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তবে মাছের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় কিছুটা স্বস্তি মিলছে ক্রেতাদের মধ্যে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মৌসুমি বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। মাঠপর্যায়ে কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলেও শহরের বাজারে পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
নিয়মিত বাজার মনিটরিং, পাইকারি ও খুচরা বাজারে কঠোর নজরদারি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা গেলে সামনে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, এমন আশঙ্কা তাদের।