বিশেষ প্রতিনিধি |
সরকারি সেবা খাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ আসলেই যে প্রতিষ্ঠানটির নাম সবার আগে সামনে আসে, তা হলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। যুগের পর যুগ ধরে এই প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা অনিয়মের গল্প নতুন কিছু নয়। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই দুর্নীতি যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল, তার অন্যতম এক জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো সার্কেল-২ এর বর্তমান উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো: সানাউল হকের নাম। বিআরটিএ’র ভেতরে-বাইরে চাউর রয়েছে—চাকরি জীবনে যেন এক ‘আলাদীনের চেরাগ’ পেয়েছেন এই কর্মকর্তা, যার জোরে আজ তিনি বিআরটিএ’র অঘোষিত ‘বাদশা’।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও, অলৌকিকভাবে বহাল তবিয়তে আছেন দুর্নীতির এই বরপুত্র। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত তহবিল গঠনে মাঠ পর্যায় থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে দেওয়ায় অন্যতম বড় ভূমিকা ছিল এই সানাউল হকের। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও, নিজের অবৈধ অর্থ ও প্রভাবের জোরে সেই তদন্তের ফাইলও তিনি ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন বলে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা বিআরটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ—কারো পক্ষ থেকেই এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সানাউল হকের দুর্নীতির খতিয়ান দীর্ঘদিনের। এর আগে তিনি যখন সিলেট ও ঢাকার মিরপুর কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন, তখনও তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল।
২০২২ সালে সিলেটে থাকাকালীন সানাউল হকের দালালদের দৌরাত্ম্য ও লাগামহীন হয়রানি এতটাই চরমে পৌঁছায় যে, তার প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয় ‘সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’। একপর্যায়ে শ্রমিকদের ডাকা পরিবহন ধর্মঘটে পুরো সিলেটে অচল অবস্থার সৃষ্টি হলে, দালালদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সিলেট থেকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছিল। তবে চট্টগ্রামে বালুছড়া বিআরটিএ কার্যালয়ে উপ-পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর তিনি যেন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এখানেও তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী ও অনুগত দালাল সিন্ডিকেট।
ভুক্তভোগী ও পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তে সানাউল হকের প্রত্যক্ষ ইশারায় প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা ঘুষের হার (ট্যারিফ) নির্ধারিত রয়েছে। সরকারি ফির বাইরে এই অতিরিক্ত টাকা না দিলে ফাইলের গায়ে কোনো হাত পড়ে না।
এক নজরে সিন্ডিকেটের ঘুষের খতিয়ান:
রুট পারমিট ও বাসের ফিটনেস: ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা।
হিউম্যান হলার: ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা।
ট্রাক ও ড্রাম ট্রাক: ২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা।
অটোরিকশা: ৪০০ টাকা।
ড্রাইভিং লাইসেন্স (অতিরিক্ত): ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা।
লাইসেন্স প্রাপ্তি (দালালের মাধ্যমে): অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ১০,০০০ এবং পেশাদারদের জন্য ১২,০০০ টাকা।
এমনকি গাড়ি না দেখেই ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া, মোটরবাইক পরিদর্শন ছাড়া রেজিস্ট্রেশন এবং চোরাই গাড়ির মালিকানা পরিবর্তনের মতো গুরুতর ও বেআইনি কাজগুলো সানাউলের নির্দিষ্ট দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা দিলেই এক নিমেষে সমাধান হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সেবাপ্রার্থীদের পকেট কেটে হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি টাকা সানাউল হক বিদেশে পাচার করেছেন। এছাড়া দেশের মাটিতেও গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। নিজ গ্রামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয়, ঢাকা শহরে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং স্ত্রী ও নিকট আত্মীয়দের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা রাখার তথ্য মিলেছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক (ইঞ্জি:) মো: সানাউল হকের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
(বিআরটিএ’র এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের উৎস ও দুর্নীতির আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দেখতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে…)