চট্টগ্রামের মেগা প্রকল্প ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ নির্মাণকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) শীর্ষ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাক্স’-এর বিরুদ্ধে মেগা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত ৩,২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রকল্পটির বর্তমান ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪,২৯৮ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মাহফুজুর রহমানের ব্যক্তিগত কূটচাল এবং লুটপাটের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়—দুটিই দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্পের মূল দরপত্র চুক্তিতে ‘মূল্য সমন্বয়ের’ (Price Adjustment) কোনো বিধান না থাকলেও, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স-কে বাড়তি সুবিধা দিতে ১৯১ কোটি টাকার একটি ফাইল ‘সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’তে পাঠানো হয়েছে।
ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল: গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে শুরুতে ফাইলটি পিডব্লিউডি-কে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলেও, পিডি মাহফুজুর রহমান তা অর্থ দিয়ে ধামাচাপা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট: পরবর্তীতে সিডিএ’র সার্বক্ষণিক সদস্য জামিলুর রহমান এবং প্রধান প্রকৌশলী আনোয়ারুল নজরুলকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে, তারাও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইতিবাচক (পজিটিভ) রিপোর্ট জমা দেন।
উদ্বোধনের পর গত দেড় বছর ধরে কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে অন্তত ১৫ কোটি টাকার টোল লুটপাট করা হয়েছে।
নেপথ্যের খলনায়ক: ফ্যাসিস্ট আমলের শীর্ষ লুটেরা ‘তমা কনস্ট্রাকশন’-এর মালিক মানিকের ভাগিনা জহির উদ্দিন (বেস্ট ইস্টার্ন) এই টোল আদায়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
লুটপাটের কৌশল: পিডি মাহফুজ ও জহির গোপনে টোলের সিংহভাগ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন। যদিও পিডি মাহফুজ সরাসরি জহিরকে চেনেন না বলে দাবি করেছেন এবং ‘সাদ্দাম হোসেন’ নামের একজনের ওপর দায় চাপিয়েছেন, যিনি মূলত জহিরেরই কর্মচারী।
বর্তমানে এই এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দৈনিক ৭-৮ হাজার গাড়ি চললেও, সব রাম্প খুলে দিলে গাড়ি চলাচল প্রায় ৯ গুণ বেড়ে (৭৭ হাজার) যাবে।
কৌশলগত জালিয়াতি: গাড়ি চলাচল বাড়ার আগেই বর্তমান কম গাড়ি চলার ওপর ভিত্তি করে কম দরপ্রস্তাবে টেন্ডার চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
লক্ষ্য একটাই—যাতে জহির উদ্দিনের ‘বেস্ট ইস্টার্ন’ লাইসেন্সটিই ইজারাদার হিসেবে চূড়ান্ত হয় এবং ভবিষ্যতে গাড়ি বাড়লেও সিডিএ-কে কম রাজস্ব দিয়ে বাকি শত কোটি টাকা পকেটে ভরা যায়।
বিগত সরকারের আমলে ‘আওয়ামী কার্ড’ ব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়া পিডি মাহফুজের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরেও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটিকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। এছাড়া বায়েজিদ বোস্তামী রোড, দেওয়ানহাট-এ.কে খান রোড ও সাগরিকা স্টেডিয়াম রোড নির্মাণেও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। লুটপাটের টাকা আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করা হয়েছে বলেও সূত্রে জানা গেছে।
সারসংক্ষেপ (এক নজরে প্রকল্পচিত্র):
প্রাথমিক বাজেট (২০১৭): ৩,২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
বর্তমান ব্যয়: ৪,২৯৮ কোটি টাকা (১,০৪৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি)।
চুক্তি বহির্ভূত অবৈধ দাবি: ১৯১ কোটি টাকা (মূল্য সমন্বয়ের নামে)।
মূল ঠিকাদার: ম্যাক্স-র্যাঙ্কিন যৌথ কোম্পানি।
মেয়াদকাল: ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০blank২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।