ঋণ কমার দাবি মেয়রের, তবে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে নজর ট্রেড লাইসেন্স ও গৃহকরে
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে যেমন নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার ব্যাপক পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ট্রেড লাইসেন্স, গৃহকর এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থানেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ৪৪টি আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্পোরেশনের নিজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়।
বাজেট বক্তব্যে মেয়র বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় চসিকের দেনার পরিমাণ ছিল ৫৯৬ কোটি টাকা। সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগের ফলে সেই দেনা বর্তমানে ৩৮০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে আয়কর হিসেবে ৪৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ৮৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনুতোষিক ও ভবিষ্যৎ তহবিলের বকেয়া পরিশোধেও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাজস্ব আদায়ে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর অংশ হিসেবে হোল্ডিং ট্যাক্সের জন্য একটি আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর ঘোষণা দেন মেয়র। এতে নাগরিকরা অনলাইনে কর পরিশোধ করতে পারবেন এবং কর নির্ধারণ ও আদায় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মেয়র জানান, চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ১০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে দেড় লাখেরও কম। এ কারণে ট্রেড লাইসেন্সের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোচিং সেন্টারসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স এবং বিজ্ঞাপন খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গৃহকর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে অযৌক্তিকভাবে নির্ধারিত কর পুনর্বিবেচনার জন্য নিয়মিত রিভিউ বোর্ড বসানো হচ্ছে। তবে বন্দর, রেলওয়ে, কনটেইনার টার্মিনাল, অয়েল কোম্পানিসহ বড় শিল্প ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া রাজস্ব আদায়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। বিএফআইডিসি সড়কে চসিকের মালিকানাধীন প্রায় ৮ একর জমি এওয়াজ বদলের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কর্পোরেশনের নিজস্ব আয় বাড়াতে ৪৪টি আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মেয়র বলেন, বন্দরের ভারী যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে নগরের সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১০ টন ধারণক্ষমতার সড়কে ২০ থেকে ৩৫ টন ওজনের যানবাহন চলাচল করায় প্রতি বছর সড়ক সংস্কারে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, ইতোমধ্যে ১৯টি খাল থেকে প্রায় ৪১ লাখ ঘনফুট মাটি ও বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৪৮টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে আরও ২০০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। মশক নিয়ন্ত্রণে আধুনিক লার্ভিসাইড ব্যবহারও শুরু হয়েছে।
বাজেটে আরও উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ পাহাড়তলীতে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য ১০ একর জমি কেনা হয়েছে। কুলগাঁওয়ে বাস ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়া চসিক প্রতিষ্ঠিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনরায় সিটি কর্পোরেশনের অধীনে এনে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। এ সময় প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী, কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কাউন্সিলর এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।