নিজস্ব প্রতিবেদক
বান্দরবানের লামা উপজেলার মানুষের কাছে মাতামুহুরী নদী যেন এক ভয়াল আতঙ্কের নাম। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই নদীর ভয়ংকর ভাঙনে হারিয়ে যায় বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, সড়কসহ বহু মানুষের জীবিকার অবলম্বন। বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের নির্মম শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন শত শত পরিবার। নদীর তাণ্ডবে অনেক পরিবারকে একাধিকবার বাড়িঘর সরিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে মাতামুহুরী নদীর ভাঙন রোধে একটি স্থায়ী ও টেকসই প্রকল্প ছিল লামাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। স্থানীয় সাংবাদিকদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন, সামাজিক আন্দোলন এবং জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘ তদবিরের পর অবশেষে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীভাঙন রোধে ব্লক স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের ঘোষণা আসার পর এলাকাজুড়ে স্বস্তি ফিরে আসে। সাধারণ মানুষ মনে করেছিলেন, বহুদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা যেন সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে। বহু প্রতীক্ষার এই প্রকল্প এখন অনিয়ম, দুর্নীতি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে দায়সারাভাবে কাজ সম্পন্ন করছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প এখন হুমকির মুখে পড়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা দুই লট ব্লকের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় ওই ব্লকগুলোর মান সন্তোষজনক না আসলেও রহস্যজনকভাবে সেগুলো বাতিল করা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নীরব সহযোগিতায় সেই নিম্নমানের ব্লকই নদীতে স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম চোখে পড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ব্লক তৈরিতে মানসম্মত পাথরের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে ময়লাযুক্ত ও অপরিষ্কার পাথর। এছাড়া নির্মাণকাজে প্রয়োজনের তুলনায় কম সিমেন্ট ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। ব্লক তৈরিতে স্থানীয় নদী থেকে উত্তোলিত অপরিশোধিত বালু ব্যবহার করায় ব্লকের স্থায়িত্ব নিয়েও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের শঙ্কা।
ব্লকগুলোর অনেকগুলোতেই ফাটল দেখা গেছে। কিছু ব্লক হাতে চাপ দিলেই ভেঙে যাওয়ার মতো দুর্বল বলে অভিযোগ করেন তারা। এলাকাবাসীর ভাষ্য, এত বড় প্রকল্পে যদি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো কাজ ধসে পড়বে। তখন আবারও ভয়াবহ নদীভাঙনের কবলে পড়বে লামার বিস্তীর্ণ এলাকা।
অভিযোগ আছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশল বিভাগের নিয়মিত তদারকি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রকল্প এলাকায় কোনো কার্যকর মনিটরিং নেই। বরং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কিছু অসাধু কর্মকর্তা অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত পার্সেন্টেজের বিনিময়ে নিম্নমানের কাজকেও অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, ২৫ কোটি টাকার এই প্রকল্প দুইটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করছে দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ায় পুরো প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, নদীভাঙন রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে এ ধরনের দুর্নীতি শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, এটি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে নির্মম প্রহসনের শামিল। তারা বলছেন, প্রকল্পটি ব্যর্থ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভাবমূর্তি এবং জনগণের আস্থা।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আপু দেবকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। এলাকাবাসী অবিলম্বে প্রকল্পের সব অনিয়ম তদন্ত, নিম্নমানের ব্লক অপসারণ, পুনরায় ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন লামাবাসী।